আন্তর্জাতিক লাটিম ঘোরানো দিবস (International Top Spinning Day) প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় বুধবারে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৪ অক্টোবর বা অর্থাৎ আজকের দিনে এই দিবসটি পালিত হচ্ছে।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনের 'স্পিনিং টপ অ্যান্ড ইয়ো-ইয়ো মিউজিয়াম' প্রথম এই দিবসটির সূচনা করে লাটিম যে কেবল একটি ঐতিহ্যবাহী খেলনা তা নয়, বরং পৃথিবী যেভাবে নিজের অক্ষের ওপর ভর করে ঘোরে—সেই বৈজ্ঞানিক সত্য ও আনন্দকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতেই এই বিচিত্র দিবসটি পালন করা হয়।
নব্বই বা আশির দশকের শৈশব যাদের কেটেছে, তাদের কাছে লাটিম কেবল একটি কাঠের টুকরো ছিল না; ওটা ছিল পকেটের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। পেয়ারা বা গাব কাঠের সেই লাটিমে আলসেমি করে রঙ করা, কিংবা বাজার থেকে কিনে আনা নতুন লাটিমটিকে আরও মসৃণ করতে শিরীষ কাগজ দিয়ে ঘষার সেই দিনগুলো আজও স্মৃতির পাতায় অমলিন। বন্ধুদের সাথে প্রতিযোগিতা করে লাটিমের গায়ে সুতো বা ‘লতি’ প্যাঁচানোর সেই নিখুঁত শৈল্পিক হাত আজ হয়তো ল্যাপটপের কীবোর্ডে কিংবা অফিসের ফাইলে ব্যস্ত। হাতের তালুতে আলতো করে লাটিম তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারার পর যখন সেটা মাটি কামড়ে ‘ঝিম’ ধরত, তখনকার সেই অনাবিল আনন্দ আজ কোটি টাকা দামের ভিডিও গেমসেও খুঁজে পাওয়া ভার। শৈশবের সেই ধুলোবালি মাখা বিকেল আর লাটিমের ‘বনবন’ শব্দ আজ কেবলই এক দীর্ঘশ্বাসের নাম।
প্রযুক্তির এই কৃত্রিম যুগে যেখানে শৈশব বন্দি হয়ে পড়েছে চারকোনা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, সেখানে আজকের দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক চিলতে হারিয়ে যাওয়া সোনালী অতীত। কাঠের তৈরি সেই ছোট্ট লাটিম আর তার গা পেঁচানো সুতোর টান—যার সাথে জড়িয়ে রয়েছে এ দেশের কোটি মানুষের শৈশবের এক অবিচ্ছেদ্য আবেগ।
একসময় গ্রাম কিংবা মফস্বলের মেঠোপথ, বাড়ির উঠোন বা স্কুলের খেলার মাঠ মেতে থাকত লাটিমের ঘূর্ণনে। বন্ধু মহলে চলত ‘ঘূর্ণন প্রতিযোগিতা’—কার লাটিম কতক্ষণ ঘুরতে পারে! আবার চলত ‘কোপ খেলা’, যেখানে অন্যের লাটিমকে নিজের লাটিমের সুচালো আল দিয়ে আঘাত করে ফাটিয়ে দেওয়ার এক রোমাঞ্চকর আনন্দ ছিল।
পেয়ারা বা গাব গাছের কাঠ খোদাই করে তৈরি সেই লাটিমে বাহারি রঙের ছোঁয়া আর যত্ন করে সুতো বা ‘লতি’ বাঁধার সেই নিখুঁত কৌশল আজ আর নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত নয়। প্রযুক্তির আগ্রাসনে আজ লাটিমের সেই চেনা ‘বনবন’ শব্দ ডানা হারিয়েছে। গ্রামীণ মেলা বা দু-একটি উৎসব ছাড়া এখন আর সহজে চোখে পড়ে না এই ঐতিহ্যবাহী খেলনা।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাদুঘরের উদ্যোগে এই দিবসটির সূচনা হলেও, বাঙালি সংস্কৃতির সাথে এর যোগসূত্র অনেক গভীর ও প্রাচীন। আজকের এই বিশেষ দিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই মেতে উঠেছেন শৈশবের সেই নস্টালজিয়ায়। দিনটি কেবল একটি খেলার স্মৃতিচারণ নয়, বরং আমাদের শিকড় আর ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে টিকিয়ে রাখার এক নীরব আহ্বান।


