...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

৬ মাসে উধাও ৩৪০০ শিশু

এস এম বাবু
প্রকাশ: ১ আগস্ট ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৫৩ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:০৮
Shares
৬ মাসে উধাও ৩৪০০ শিশু

রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা মিরপুর। ইট পাথরের চিরচেনা এই শহরের বুকে ভর করেছে অজানা এক উধাও আতঙ্ক। মাত্র চারদিনের ব্যবধানে একই এলাকা থেকে উধাও হয়ে গেছে দুটি ফুটফুটে শিশু। আড়াই মাস পেরোলেও  মেলেনি খোঁজ। সন্তানের অপেক্ষায় বুকফাটা কান্না আর আহাজারি চলছে পরিবারগুলোতে। পৃথক দুটি নিখোঁজ মামলা হলেও তদন্তে সুরাহা হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসন কি তবে পথ হারিয়েছে, না নেপথ্যে রয়েছে ভয়ংকর কোনো পাচার চক্র? টাইমস টুডের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গেল ১৩ মে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট। মিরপুরের পল্লবী থানা এলাকা থেকে নিখোঁজ ৫ বছরের শিশু ইব্রাহিম খলিল (পল্লবী থানায় দায়ের করা মামলা নম্বর ১১৩৪, তারিখ ১৪/০৫/২০২৬)। আড়াই মাস পার হলেও পুলিশি তদন্তে  নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া একটি সিসিটিভি ফুটেজ নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। 

নিখোঁজের চারদিন পর পরিবারের সংগ্রহ করা ওই ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে ইব্রাহিম তার বাড়িওয়ালা শফিকুল ইসলামের (ছদ্মনাম) পেছনে পেছনে বাসার ভেতরে প্রবেশ করছে। এরপর রাত ১২টা পর্যন্ত ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করেও তাকে আর বের হতে দেখা যায়নি। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, শিশুটি ভেতরে প্রবেশের প্রায় ১০ মিনিট পর বাড়ির ভেতর থেকে একটি আর্তচিৎকার শোনা যায়। 

উধাও হওয়া সন্তান ইব্রাহিমের মা খোলাখুলি কথা বলেছেন  টাইমস টুডের সঙ্গে । তার কথায় উঠে এসেছে সব ভয়ের এক করুণ ইতিহাস। তিনি বলেন, আমাদের কারও সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না। এত বড় প্রমাণের পরও বাড়িওয়ালাকে কেন কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো না? তাকে আইনের আওতায় আনলেই আসল রহস্য বেরিয়ে আসতে পারে। 

এ বিষয়ে অভিযুক্ত বাড়িওয়ালার বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান মিজানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এড়িয়ে যান । তার দায়সারা বক্তব্য ভিন্ন  কিছু প্রমাণ করে।  তিনি বলেন, মামলাটি এখন আর তার কাছে নেই, নতুন কর্মকর্তা তদন্ত করছেন।

এদিকে, ইব্রাহিমের নিখোঁজ হওয়ার ঠিক চারদিন আগে, ৯ মে মিরপুরের দারুস সালাম এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় ৯ বছরের শিশু আলী হোসেন (জিডি নম্বর.৬২২, তারিখ ১০/০৫/২০২৬)। বিকেলে খেলতে বের হওয়ার পর সে আর বাড়ি ফেরেনি। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় হন্যে হয়ে খুঁজেও সন্তানের সন্ধান পায়নি পরিবার।

আলী হোসেনের বাবা টাইমস টুডের এক স্বাক্ষাৎকারে বলেন, প্রতিদিন বিকেলে ছেলেটা বল নিয়ে বের হতো। কে জানত সেদিনই ওর শেষ খেলা! পুলিশ শুধু বলে ‘দেখছি’, কিন্তু আমার মানিক তো আর ফেরে না।

সারা দেশেই নিখোঁজ-আতঙ্ক

মিরপুরের এই দুটি ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। বেসরকারি সংস্থা মুন অ্যালার্ট-এর তথ্য বলছে, গেল ছয় মাসে দেশে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ১৯ জন শিশু! রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে এই আতঙ্ক ছড়িয়েছে প্রান্তিক জনপদেও। চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ এবং পাবনা থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এসব এলাকাতেও শিশু নিখোঁজের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় সাতক্ষীরা ও ঝিনাইদহে পাচার চক্রের সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক শিশু নিখোঁজের পেছনে মূলত পাচার চক্র, মুক্তিপণ আদায় এবং পারিবারিক বিরোধ কাজ করছে। নিখোঁজ শিশুদের একটি বড় অংশ সীমান্ত পেরিয়ে পাচার হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উদ্ধারের হার হতাশাজনক হওয়ার পেছনে সমন্বিত ডাটাবেজের অভাব এবং পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধীরগতিই প্রধান কারণ। অভিযোগ দায়েরের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আইনি দীর্ঘসূত্রিতায় অপরাধীরা সহজেই এলাকা ছাড়ার সুযোগ পেয়ে যায়।

সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, শিশুরা শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় তাদের সহজেই টার্গেট করা যায়। এ কারণেই অপরাধীরা শিশুদের নিশানা করার প্রবণতা বাড়িয়েছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হকের মতে, শিশু অপহরণের পেছনে মাদকের বিস্তার এবং বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি বড় ভূমিকা রাখছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (এডিসি) মেহেদী নিয়াজ জানান, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি নিখোঁজ ডায়েরি ও মামলার তদন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অব্যাহত রয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, পুলিশের এই অব্যাহত তদন্তে বাস্তব কোনো অগ্রগতি নেই। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ইব্রাহিম ও আলী হোসেনের মতো হাজারো শিশুর ভাগ্য অন্ধকারের অতল গহ্বরেই হারিয়ে যাবে।