দেশজুড়ে সম্ভাবনা। নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন সবই আছে। শুধু নেই সেগুলো দেখার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের মুনাফা। ৫৩ বছর ধরে পর্যটনের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন দাঁড়াতে পারেনি নিজের পায়ে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে দেশের উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা রয়েছে পর্যটন খাতে। তবে, দীর্ঘদিন ধরে মুনাফার মুখ না দেখলেও ধুঁকছে লোকসানের পাহাড়ে। বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনছে এই প্রতিষ্ঠান। বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প। নামিদামি মোটেলেও ঝুলছে তালা। অব্যবস্থাপনায় খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে দেশের পর্যটন খাত। টাইমস টুডের অনুসন্ধান ও প্রতিষ্ঠানটির সবশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে হতাশাজনক চিত্র।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির মোট মুনাফা ৩৭ কোটি ৩ লাখ টাকা, গড়ে বছরে প্রায় ৭০ লাখ। ৫৩ বছরের ১৮ বছরই কেটেছে লোকসানে। এদিকে, গেল অর্থবছরে সামান্য যে মুনাফা দেখছে, পুরোটাই এসেছে বিমানবন্দরের ডিউটি ফ্রি দোকান থেকে। তা বাদ দিলে বাকি ইউনিটগুলোর ঘাটতি ২৫ কোটি টাকারও বেশি। এক বছরে মূলধনী ব্যয় ১০ গুণ বেড়ে প্রায় ১২০ কোটি টাকা হয়েছে। চারটি বড় প্রকল্পের একটিও হয়নি সমাপ্ত।
প্রতিবেদনে, ২০২৬ থেকে ২০৩৫ পর্যন্ত পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে মহাখালীতে বহুতল ভবন, কক্সবাজারে পিপিপিতে আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা এবং বগুড়ায় ৫ তারকা রিসোর্ট। করপোরেশনের ভূসম্পত্তি ৩৯৯ একরের বেশি থাকলেও চলমান প্রকল্পই শেষ হয়নি। বিশ্ব জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় ১০%, সেখানে বাংলাদেশে মাত্র ৩%। কর্মসংস্থানে অবদান ১.৭%, যা এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় আশাব্যঞ্জক নয়। সম্ভাবনার দেশে পর্যটনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটিই যখন লোকসান, জনবল সংকট আর অসমাপ্ত প্রকল্পের ভারে নুয়ে পড়ে, তখন খাতটির উন্নয়ন কীভাবে হবে, সেই প্রশ্ন করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লোকসানের ইতিহাস
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালে সাতটি ইউনিট নিয়ে যাত্রা শুরু করে করপোরেশন। এখন ইউনিট সংখ্যা প্রায় ৫৪টি। ১৯৭২-৭৩ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত মোট আয় ২ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকার বেশি, ব্যয় ২ হাজার ৪২৯ কোটি টাকার বেশি। শুরুর টানা ১১ বছর লোকসান। পরবর্তীতে ২০০৬-০৭ থেকে ২০০৮-০৯ পর্যন্ত আরও তিন বছর। সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৬-১৭, ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরেও ঘাটতি ছিল। ২০১৯-২০-এ লোকসান ছিল প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা, ২০২০-২১-এ ৫ কোটি ২৫ লাখ।
তবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে করপোরেশনের আয় ১৫১ কোটি ১৬ লাখ টাকা, ব্যয় ১৫০ কোটি ১৮ লাখ। করপূর্ব মুনাফা ৯৭ লাখ ৯১ হাজার, আয়ের এক শতাংশেরও কম।
ডিউটি ফ্রিই একমাত্র ভরসা
ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের তিন বিমানবন্দরে প্রতিষ্ঠানটির সাতটি ডিউটি ফ্রি শপ, স্ন্যাকস কর্নার ও কফি শপ রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু ডিউটি ফ্রি বিভাগ থেকে আয় হয়েছে ৬৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা, মুনাফা ২৬ কোটি ৭২ লাখ। মোট আয়ের প্রায় ৪২ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। প্রতিষ্ঠানের মোট মুনাফা ৯৭ লাখ ৯১ হাজার টাকা। ডিউটি ফ্রির মুনাফা বাদ দিলে বাকি ইউনিটগুলোর ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ২৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ৫৪টি বাণিজ্যিক ইউনিটের মধ্যে হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, বার ও পিকনিক স্পট থাকলেও লাভের ভার কার্যত একটি খাতই বইছে।
ছয় মাসে মুনাফা উধাও
২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে মুনাফার লক্ষ্য ছিল প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা নামিয়ে আনা হয় ২৫ লাখে। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে মুনাফা দেখানো হয় ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। বছর শেষে তা নেমে আসে ৯৭ লাখ ৯১ হাজারে। অর্থাৎ শেষ ছয় মাসে প্রায় ৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার লোকসান হয়েছে। এর কোনো ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে নেই।
এক বছরে ব্যয় ১০ গুণ
২০২৩-২৪-এ মূলধনী ব্যয় ছিল ১২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। পরের বছর তা হয় ১১৯ কোটি ৮০ লাখ। এর মধ্যে সরকারি অনুদান ৯৮ কোটি ৮৫ লাখ, নিজস্ব তহবিল ২০ কোটি ৯৫ লাখ। যে বছর মুনাফা এক কোটিরও কম, সে বছর নিজস্ব তহবিল থেকে ২১ কোটি টাকা কীভাবে খরচ হলো, তা স্পষ্ট নয়।
গরমিল আরও আছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উন্নয়ন প্রকল্পে ১৫ কোটি ১১ লাখ বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় ১১ কোটি ৯৮ লাখ, এডিপি বাস্তবায়ন ৭৮%। অঙ্ক একই, মাত্রা ১০ গুণ আলাদা। আবার সরকারি অনুদানের আলাদা তালিকায় ২০২৪-২৫-এ অনুদান দেখানো হয়েছে ১১ কোটি ৬৭ লাখ, অথচ মূলধনী ব্যয়ে সরকারি অনুদান ৯৮ কোটি ৮৫ লাখ। কোন হিসাব সঠিক, প্রতিবেদনে তার উত্তর নেই।
খুঁড়িয়ে চলা প্রকল্প
বছরের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির হাতে ২০৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকার পাঁচটি উন্নয়ন প্রকল্প ছিল।
পঞ্চগড় পর্যটন কেন্দ্র: ব্যয় প্রাক্কলন ৪৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত খরচ ১০ লাখ, বাস্তব অগ্রগতি শূন্য। শেষ হওয়ার কথা ছিল ওই মাসেই। এরপরও মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে।
হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপ: ৪৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকার প্রকল্পে আর্থিক অগ্রগতি ১৫.৮৯%, ভৌত ১৬%। মেয়াদ ২০২৯ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব আইএমইডিতে।
চট্টগ্রামের পারকি: ৭১ কোটি ২৫ লাখ টাকার প্রকল্পের কাজ ৩০ জুন ২০২৬-এ শেষ হওয়ার কথা ছিল, যা পেরিয়ে গেছে। ভৌত অগ্রগতি ৮২% দেখিয়ে মেয়াদ চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা: ২৫ কোটি টাকার প্রকল্পে বাস্তব অগ্রগতি ৬০%। কাজ শেষ হওয়ার কথা ডিসেম্বর ২০২৬-এ।
ট্যুরিস্ট কোচ: তিন দফা দরপত্র ডেকেও কোনো প্রতিষ্ঠান সাড়া দেয়নি। বৈশ্বিক মন্দার কারণ দেখিয়ে প্রকল্প অসমাপ্ত রেখেই বাতিল করা হয়েছে।
অর্ধেকের বেশি পদ ফাঁকা
১৯৭২ সালে অনুমোদিত পদ ছিল ১ হাজার ৩৭২টি। এখন ৭০৯টি। এর ৩৯৪টি (প্রায় ৫৬%) খালি। কর্মকর্তার ১৯৪ পদে আছেন ১৬৭ জন। কর্মচারীর ৫১৫ পদে আছেন মাত্র ১৪৮ জন, অর্থাৎ ৭১% পদ ফাঁকা।
৩১৫ জন নিয়মিত কর্মীর বিপরীতে দৈনিক মজুরিতে কাজ করছেন ৬৬৮ জন, নিয়মিতের দ্বিগুণেরও বেশি। এতে সেবার মান বিঘ্নিত হচ্ছে, প্রশাসনিক দুর্বলতাও স্পষ্ট। এই কর্মীদের চাকরির নিশ্চয়তাও নেই।
তালাবন্ধ মোটেল, লিজের পথে ইউনিট
কক্সবাজারের মোটেল লাবণীর কার্যক্রম বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ। একাধিক বাণিজ্যিক ইউনিট ক্রমাগত লোকসানি বলে পরিচিত। কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে না পারায় সেগুলো বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এখনই প্রতিবেদনের তালিকায় ডজনখানেক ইউনিট বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলছে, যার মধ্যে রাজশাহী, বগুড়া, মংলা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটির বার রয়েছে।
স্বপ্ন ২০৩৫, বাস্তবতা থমকে
প্রতিবেদনে ২০২৬ থেকে ২০৩৫ পর্যন্ত পরিকল্পনা রয়েছে। এতে আছে মহাখালীতে বহুতল ভবন, কক্সবাজারে পিপিপিতে আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা এবং বগুড়ায় ৫ তারকা রিসোর্ট। করপোরেশনের ভূসম্পত্তি ৩৯৯ একরের বেশি। অথচ চলমান প্রকল্পই শেষ হয়নি।
বিশ্ব জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় ১০%, বাংলাদেশে মাত্র ৩%। কর্মসংস্থানে বাংলাদেশের অবদান ১.৭% যা এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় আশাব্যঞ্জক নয়। সম্ভাবনার দেশে পর্যটনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটিই যখন লোকসান, জনবল সংকট আর অসমাপ্ত প্রকল্পের ভারে নুয়ে পড়ে, তখন খাতটির উন্নয়ন কীভাবে হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান সামীমুজ্জামান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, মাত্র ২ মাস আগে দায়িত্বে এসেছি। জড়িত প্রতিটি দফতরের প্রধান এবং স্টেকহোল্ডারদের সাথে বসছি। সব বিষয়ে আলাপ আলোচনা চলছে। প্রতিষ্ঠানটিকে লোকাসন থেকে বের করে সময়োপযোগী এবং কীভাবে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রুপ দেওয়া যায় সে লক্ষ্যে কাজ করছি। মুনাফা বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্ভাবনাময় এ খাতকে পর্যটনবান্ধব গড়ে তোলাই আমাদের চ্যালেঞ্জ।

