ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু দুনিয়ার জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়। মুমিন স্বামী ও স্ত্রী জান্নাতেও একে অপরের সঙ্গী হবেন। তবে জান্নাতে মুমিন পুরুষদের জন্য হুরের ব্যবস্থা থাকবে- এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে, স্বামীর কাছে তার দুনিয়ার মুমিন স্ত্রী বেশি প্রিয় হবেন, নাকি জান্নাতের হুররা?
এ বিষয়ে কোরআন, হাদিস ও আলেমদের ব্যাখ্যায় বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
হুরদের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য
হুর হলো জান্নাতের সেই বিশেষ নারীসঙ্গী, যাদের আল্লাহ মুমিন পুরুষদের জন্য সৃষ্টি করবেন। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে তাদের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যের প্রশংসা করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমি বস্ত্র এবং মুখোমুখি হয়ে বসবে। অনুরূপ আমি তাদের সঙ্গিনী দান করব আয়তলোচনা হুর।’ (সুরা দুখান, আয়াত ৫৩-৫৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসেও জান্নাতের নারীদের অসাধারণ সৌন্দর্যের কথা এসেছে। তিনি বলেন, ‘জান্নাতি কোনো নারী যদি দুনিয়াবাসীদের প্রতি উঁকি দেয় তাহলে আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী সব কিছু আলোকিত এবং সুরভিত হয়ে যাবে। আর তার মাথার ওড়না দুনিয়া ও তার সব কিছুর চেয়ে উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৭৯৬)
জান্নাতে মুমিন নারীদের সৌন্দর্য
কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, জান্নাতে মুমিন নারীদের সৌন্দর্যও হবে অতুলনীয়। দুনিয়ায় মানুষের যেসব অপূর্ণতা ছিল, জান্নাতে আল্লাহ তা দূর করে দেবেন এবং তাদের নতুন রূপে সৌন্দর্যমণ্ডিত করবেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের আমি সৃষ্টি করেছি বিশেষরূপে, তাদের করেছি কুমারী, সোহাগিনি ও সমবয়স্কা, ডান দিকের লোকদের জন্য।’ (সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত ৩৫-৩৮)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যেসব নারী পৃথিবীতে বৃদ্ধা, ছানিপড়া চোখ বা দুর্বল দৃষ্টিসম্পন্ন তারা জান্নাতে বাড়ন্ত বয়সের তরুণীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৩২৯৬)
মুমিন স্ত্রী নাকি হুর- কে বেশি সুন্দর?
জান্নাতে হুর ও মুমিন নারীদের মধ্যে কে বেশি সুন্দর ও মর্যাদাবান হবেন- এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে।
ইমাম কুরতুবি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, একদল আলেমের মতে হুররা মানুষের চেয়ে বেশি সুন্দর ও মর্যাদাবান হবে। আবার অন্য একদল আলেমের মত হলো, পৃথিবীর মুমিন নারীরা হুরদের চেয়ে ৭০ হাজার গুণ বেশি সুন্দর হবেন।
হাইয়ান বিন আবি জাবালাহ (রহ.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই পৃথিবীর যে নারী জান্নাতে প্রবেশ করবে তারা হুরদের ওপর প্রাধান্য পাবে দুনিয়ায় তাদের করা নেক আমলের জন্য।’ (তাফসিরে কুরতুবি, ২০/১৬৫)
আল্লামা শামসুদ্দিন সাফিরি (রহ.)-ও দুনিয়ার মুমিন নারীরা অধিক মর্যাদাবান ও সুন্দর হওয়ার মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি উম্মে সালমা (রা.)-এর বর্ণিত একটি হাদিসকে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন।
উম্মে সালমা (রা.) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! পৃথিবীর নারীরা উত্তম, নাকি হুর?’ তিনি বলেন, ‘বরং পৃথিবীর নারীরা হুরদের থেকে উত্তম। যেমন- কাপড়ের বাইরের অংশের তুলনায় ভেতরের অংশ।’
আমি জানতে চাইলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! সেটা কিসের বিনিময়ে?’ তিনি বলেন, ‘দুনিয়াতে তাদের নামাজ, রোজা ও ইবাদতের বিনিময়ে।’ (তাবরানি, হাদিস ৮৭০; আল মাজালিসুল ওয়াজিয়্যাহ, ২/৩৫)
হুর কি পৃথিবীর মুমিন নারীদেরই নতুন রূপ?
হুরদের পরিচয় নিয়েও আলেমদের মধ্যে একটি মতভিন্নতা রয়েছে। হাসান বসরি (রহ.)-সহ একদল আলেমের মতে, কোরআনে বর্ণিত ‘হুরুল ঈন’ বলতে নবী ও মুমিনদের মুমিন স্ত্রীদের বোঝানো হয়েছে। তাদের জান্নাতে বিশেষ সৌন্দর্য ও অবয়ব দিয়ে নতুন করে সৃষ্টি করা হবে। (তাফসিরে কুরতুবি, ২০/১৬৬)
অর্থাৎ এই মত অনুযায়ী, জান্নাতে মুমিন পুরুষরা যে অপরূপ সুন্দর নারীদের পাবেন, তারা মূলত দুনিয়ার মুমিন নারীরাই; আলাদা কোনো সৃষ্টি নন।
তবে প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ মত হলো, জান্নাতের হুররা আল্লাহর পৃথক সৃষ্টি। মুমিন বান্দাদের জন্য আল্লাহ তাদের সৃষ্টি করবেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের মধ্যে আছে বহু আনত নয়না, যাদের পূর্বে কোনো মানুষ অথবা জিন স্পর্শ করেনি।’ (সুরা আর-রহমান, আয়াত ৫৬; তাফসিরে কুরতুবি, ২০/১৬৬)
এই আয়াতে ‘যাদের পূর্বে কোনো মানুষ অথবা জিন স্পর্শ করেনি’- এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, হুররা পৃথিবীর নারী বা মুমিন স্ত্রীদের বাইরে পৃথক সৃষ্টি।
সব মিলিয়ে, জান্নাতে হুর ও মুমিন নারীদের সৌন্দর্য, মর্যাদা এবং পরিচয় নিয়ে আলেমদের মধ্যে কিছু মতভিন্নতা রয়েছে। তবে দুনিয়ার মুমিন নারীদের মর্যাদা ও সৌন্দর্য যে জান্নাতে বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাবে, সে বিষয়ে কোরআন-হাদিসে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়।
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।


