বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে চার দেশকে বিশেষ ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশগুলো হলো ভারত, চীন, ইরাক ও কাতার। তবে অন্য দেশের জাহাজগুলো কবে এই সুবিধা পাবে, সে বিষয়ে এখনও কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি তেহরান।
গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোঘাদ্দাম দেশটির সংবাদমাধ্যম আইএসএনএকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
তিনি বলেন, ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের জাহাজগুলো বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাধাহীনভাবে যাতায়াত করছে। এমনকি মার্কিন বাহিনীও এসব জাহাজের চলাচলে বাধা দিচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। এরপর জুলাইয়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার দেশকে ছাড় দেওয়ার পেছনে ইরানের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। ইরানি আইনপ্রণেতার ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ আমদানি এবং চীনের রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করতেই দেশ দুটিকে এ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
তবে ভারত ও চীনের জাহাজগুলোকে হরমুজ অতিক্রমের জন্য নির্ধারিত ফি দিতে হবে। বিপরীতে কাতারের জাহাজ চলাচলে কোনো অর্থ নেওয়া হবে না। ইরাকের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে কি না, তা স্পষ্ট করেননি মোঘাদ্দাম।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একদিকে নতুন রাজস্ব আয়ের পথ তৈরি করতে চাইছে তেহরান, অন্যদিকে ইরানের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধের কার্যকারিতা কমানোর কৌশল নিয়েছে। বিশেষ করে ইরানের মোট তেল রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশের ক্রেতা চীন। ফলে দেশটির জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে ইরান।
তবে তেহরানের এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড আগেই জানিয়েছে, ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ কিংবা সেখান থেকে বের হওয়া সব দেশের জাহাজই মার্কিন অবরোধের আওতায় থাকবে। তবে ইরানের বন্দর ব্যবহার করে না, এমন জাহাজের চলাচলে বাধা দেওয়ার কথা জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
এ পরিস্থিতিতে ভারত ও চীনের জাহাজকে ইরানের বন্দরে যাতায়াতের সুযোগ দিতে ওয়াশিংটন সম্মত হবে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যবস্থা মেনে নিলে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান নৌ অবরোধ বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি পেলেও হরমুজ ও আশপাশের জলসীমায় জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। গত ৩০ অক্টোবর উপসাগরীয় অঞ্চলে কাতারের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) জাহাজে অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানে।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ওই অঞ্চলে ১২০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
ফলে চার দেশের জন্য হরমুজের পথ উন্মুক্ত হলেও অন্য দেশগুলোর জাহাজ চলাচলের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। পাশাপাশি ইরানের সিদ্ধান্তের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী হবে, তার ওপরও নির্ভর করছে এই বিশেষ ছাড়ের কার্যকারিতা।


