স্বামী-স্ত্রী দীর্ঘদিন আলাদা থাকলেই তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। এক বছর, তিন বছর কিংবা তারও বেশি সময় আলাদা বসবাস করলেও শুধু এ কারণে ইসলামী শরিয়তে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয়ে যায় না। ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, তালাক, খুলা কিংবা শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহবিচ্ছেদের অন্য কোনো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটতে পারে।
আলাদা থাকলেই কি তালাক হয়ে যায়
ইসলামে বিয়ে একটি স্বীকৃত বৈবাহিক বন্ধন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য, ঝগড়া, যোগাযোগ বন্ধ থাকা কিংবা আলাদা বসবাসের কারণে সেই বন্ধন নিজে থেকে ছিন্ন হয় না।
ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়ায় বলা হয়েছে, স্বামী-স্ত্রী এক বছর আলাদা থাকলেও শুধু এ কারণে তালাক হয় না। একইভাবে তিন বছর বা তার কম সময় আলাদা থাকলেও তালাক কার্যকর হয় না, যদি বিবাহবিচ্ছেদের অন্য কোনো স্বীকৃত কারণ বা প্রক্রিয়া না থাকে।
ইসলামে কীভাবে বিবাহবিচ্ছেদ হয়
ইসলামী ফিকহে বিবাহবিচ্ছেদের একাধিক স্বীকৃত পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বামীর তালাক, পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে খুলা এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ বা বিবাহ বাতিলের ব্যবস্থা। কোন পদ্ধতি কীভাবে কার্যকর হবে, তা পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য শরিয়তসম্মত বিধানের ওপর নির্ভর করে।
তাই স্বামী-স্ত্রী দীর্ঘদিন আলাদা থাকলেও তালাকের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে কি না, খুলার মাধ্যমে বিচ্ছেদ হয়েছে কি না কিংবা কোনো স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন কি না, তা যাচাই করা জরুরি। শুধু আলাদা থাকার সময় হিসাব করে তালাক হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
চার মাস আলাদা থাকলে কি তালাক হয়
অনেকের ধারণা, স্বামী-স্ত্রী চার মাস আলাদা থাকলে তালাক হয়ে যায়। তবে বিষয়টি এভাবে সাধারণ নিয়ম হিসেবে বলা সঠিক নয়। ইসলামী ফিকহে ‘ইলা’ নামে একটি বিশেষ বিধান রয়েছে। স্বামী স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন না করার শপথ করলে এ বিধান প্রাসঙ্গিক হতে পারে। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-বাকারার ২২৬-২৭ নম্বর আয়াতে এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে।
তবে শুধু চার মাস আলাদা থাকা আর দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন না করার শপথ করা এক বিষয় নয়। শপথের ধরন, উদ্দেশ্য এবং পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় এ বিধানের প্রয়োগ নির্ধারিত হয়। তাই চার মাস আলাদা থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয়ে যায় এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।
স্বামী দায়িত্ব পালন না করলে স্ত্রীর করণীয় কী
স্বামী দীর্ঘদিন আলাদা থাকলে, ভরণপোষণ না দিলে কিংবা দাম্পত্য দায়িত্ব পালন না করলে স্ত্রীকে অনির্দিষ্টকাল অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হবে ইসলামে এমন ধারণা সঠিক নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী স্ত্রী পারিবারিকভাবে সমঝোতার চেষ্টা করতে পারেন এবং যোগ্য আলেম বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নিতে পারেন। প্রয়োজন হলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদের ব্যবস্থাও নিতে পারেন।
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইনেও শুধু আলাদা বসবাসের কারণে বিবাহবিচ্ছেদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না।
তালাকের পরও কি ইদ্দত পালন করতে হয়
দীর্ঘদিন আলাদা থাকার পর তালাক কার্যকর হলে শুধু আগে থেকেই আলাদা ছিলেন বলে স্ত্রী ইদ্দত থেকে অব্যাহতি পাবেন এমন নয়। ইদ্দত পালনের বিধান প্রযোজ্য হবে কি না এবং কত দিন পালন করতে হবে, তা বিবাহের অবস্থা, দাম্পত্য সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। এ বিষয়ে ব্যক্তিগত ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে স্বামী-স্ত্রী দীর্ঘদিন আলাদা থাকলেই তালাক হয়ে যায় না। এক বছর, তিন বছর কিংবা আরও বেশি সময় আলাদা থাকলেও শুধু সময়ের ব্যবধানে বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ হয় না।
তালাক, খুলা বা শরিয়তসম্মত অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় বিচ্ছেদ ঘটেছে কি না, সেটিই মূল বিষয়। নির্দিষ্ট কোনো ঘটনায় তালাক কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে যোগ্য মুফতির পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের আইনগত অবস্থাও যাচাই করে নেওয়া উচিত।


