জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির (জেডিপি) আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ। তার মতে, এ লক্ষ্য অর্জনে জেডিপি ও সমমনা সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্ষমতায় আসতে হবে। বিএনপি সরকার জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করবে, এমন কোনো সম্ভাবনা আর নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে ‘সর্বদলীয় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন অনিবার্য হয়ে পড়েছে বলে জানান জেডিপির এই নেতা।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের সামনে জুলাই সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত মানববন্ধনে এসব কথা বলেন নাঈম আহমাদ। ‘জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে’ এ কর্মসূচির আয়োজন করে জেডিপি।
জুলাই সনদ নিয়ে ধাপে ধাপে প্রতারণা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন নাঈম আহমাদ। তিনি বলেন, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী-অর্থাৎ বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল-জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে যেসব বিষয়ে একমত হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই বিএনপি অমান্য করছে। অন্যদিকে, জামায়াত কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করে সেগুলো মেনে নিচ্ছে।
জুলাই সনদের ২৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দল থেকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অলংকার’ কিংবা ‘অনুগ্রহের পদ’ বিবেচনা করে জামায়াত সেই পদ গ্রহণ করেনি। অথচ সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির প্রধানের পদটি তারা গ্রহণ করেছে। যদিও, জুলাই সনদের ২৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী সংসদের চারটি স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার কথা, কিন্তু জামায়াত চারটির পরিবর্তে মাত্র একটি পদ পেয়েই নীরব রয়েছে। বাকি তিনটি পদে বিএনপিই নিয়োগ দিয়েছে। জুলাই সনদের ২৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও নাটকীয়তা দেখা গেছে। এগুলো সরকার ও বিরোধী দলের যৌথ প্রতারণা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার পিতার প্রণীত আইনও বাস্তবায়নে তৎপর হচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন জেডিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, জুলাই সনদের ৩৯ নম্বর ধারায় ন্যায়পাল নিয়োগের কথা রয়েছে। বর্তমান সংবিধানেও ন্যায়পালের বিধান রয়েছে। এমনকি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৮০ সালের ৯ এপ্রিল ন্যায়পাল আইন, ১৯৮০ প্রণীত হয়। কিন্তু তার সন্তান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই আইনও এখনো কার্যকর করেননি। ফলে শুধু সংবিধান বা জুলাই সনদ নয়, তিনি তার পিতার প্রণীত আইনকেও অবহেলা করছেন।
নাঈম আহমাদ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করলে বিএনপিকে বেশ কিছু 'অসুবিধায়' পড়তে হবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সনদের ১৬ নম্বর ধারা মানলে বিএনপি নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে পারবে না। ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্বাচনে ৩৩ শতাংশ নারীকে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন দিতে হবে। ২৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে হবে; ফলে নিজেদের ইচ্ছামতো বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, সনদের ৫৯, ৬০ ও ৬১ নম্বর ধারা বাস্তবায়িত হলে আদালতপাড়ায় দলীয় আইনজীবীদের অপরাজনীতির সুযোগ সীমিত হবে। ৬৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী ভোট কারচুপি ও জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠন করতে হবে। ৬৯ নম্বর ধারা বাস্তবায়িত হলে পুলিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারবে না; বরং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করতে হবে।
জেডিপির আহ্বায়ক আরও বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সনদের ৭৫ নম্বর ধারা বাস্তবায়িত হলে দুর্নীতিবাজদের দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হবে। তখন দেখা যাবে, বিএনপি অনেক আসনে প্রার্থী দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। ফলে বিএনপি মুখে যা-ই বলুক, দলটির পক্ষে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
জেডিপি জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চায় উল্লেখ করে নাঈম আহমাদ বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংস্কারের পক্ষে থাকা সব রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করতে হবে। একই সাথে এখন থেকেই ৩০০টি সংসদীয় আসনে বিজয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমন্বিত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির রূপরেখা তৈরি করতে হবে। অন্যথায় জুলাই সনদের বাস্তবায়ন সুদূরপরাহতই থেকে যাবে।
জেডিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মাহতাব হোসেন সাব্বিরের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন জেডিপির প্রধান সংগঠক আহছান উল্লাহ, জনতার দলের যুগ্ম মহাসচিব স্বনাম ফুয়াদ, জেডিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ইয়াসিন আরাফাত রাজ ও জাতীয় ছাত্রমঞ্চের প্রধান সংগঠক সালমান শরীফ প্রমুখ।


