শিবিরের ‘স্পাই’ সন্দেহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ শামসুজ্জোহা হলের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, হলে সিট দেওয়ার কথা বলে তার মোবাইল ফোন নিয়ে শিবিরের সাথে যোগাযোগের তথ্য খোঁজা হয়। পরে তাকে ‘শিবিরের স্পাই’ আখ্যা দিয়ে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ, হেনস্তা ও মারধর করা হয়। গভীর রাতে তাকে হল প্রভোস্টের কক্ষে নিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দের চেষ্টার অভিযোগও করেছেন হল সংসদের ভিপি। তবে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাত্রদল নেতারা।
ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আসিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
আসিফ বলেন, ‘আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। এ কারণে হলে একটি সিটের জন্য প্রভোস্ট স্যারের কাছে কয়েকবার অনুরোধ করেছি। পরে গণরুমে ফাঁকা সিটের বিষয়ে জানতে গেলে আমাকে ছাত্রদলের হল সভাপতি ফুয়াদ ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়। তার সাথে কথা বললে তিনি ছাত্রদল করতে হবে এবং ছাত্রদল করলেই সিট দেওয়া হবে বলে জানান। পরিবারের পরিস্থিতির কারণে আমিও সিটের আশায় ছাত্রদলের সাথে প্রোগ্রাম করার বিষয়ে রাজি হই।’
তিনি বলেন, ‘পরে রাতে তার কক্ষে গেলে একটি গ্রুপে যুক্ত করে দেওয়ার কথা বলে তিনি আমার মোবাইল ফোন নেন। এরপর ফোনের বিভিন্ন বিষয় চেক করে আমাকে শিবির করার এবং ‘শিবিরের স্পাই’ হিসেবে হলে আসার অভিযোগ করেন। আমি বিষয়টি অস্বীকার করে সিটের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ করি। একপর্যায়ে তিনি আমাকে ধমক দেন এবং পরে ছাত্রদলের আরও কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে আসেন। তারা আমাকে টেনে গণরুমে নিয়ে যান এবং সেখানে আমার ওপর হাত তোলা ও মারধর করা হয়। জোহা হলের সেক্রেটারি সবুজ আহমেদও সেখানে ছিলেন এবং তিনিও আমাকে মারধর করেন।’
আসিফের অভিযোগ, ‘মারধরের পরও আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং বারবার বলা হয়, আমি নাকি শিবিরের স্পাই হিসেবে সেখানে এসেছি। আমাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি মেরে ফেললেও কেউ কিছু করতে পারবে না এবং পুকুরে ফেলে দেওয়ার মতো কথাও বলা হয়। ছাত্রলীগের সময় কী হয়েছে, সেসব উদাহরণ দিয়েও আমাকে ভয় দেখানো হয়। এসব ঘটনায় আমি এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি যে প্রভোস্ট স্যারের সামনে থাকলেও কিছু বলতে পারিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে আমার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও ধারণ করা হয়। আমার কাছ দিয়ে বিভিন্ন কথা বলিয়ে ভিডিও করা হয়। এমনকি আমাকে দিয়ে লিখিয়েও নেওয়া হয় যে আমি নাকি নেতা হতে চাই। এভাবে আমার কাছ থেকে একটি স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছে।’
আসিফ বলেন, ‘আমি এখন খুবই আতঙ্কের মধ্যে আছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, আমার বিভাগ ও শিক্ষকদের কাছে সহযোগিতা চাই। আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং আমি যেন নিরাপদে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারি।’
শহীদ শামসুজ্জোহা হলের ভিপি আশিকুর রহমান সোহাগ বলেন,সোমবার দিনগত রাত ৪টার দিকে হলের প্রভোস্ট আমাকে তার কক্ষে ডাকেন। সেখানে গিয়ে দেখি, একটি সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী এক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। এ সময় তারা ওই শিক্ষার্থীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন। আমি হলের ভিপি হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাই, বাইরের শিক্ষার্থীরা রাত ৪টার সময় হলে কেন এবং কী কারণে ওই শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, হলের প্রভোস্টের সামনে ওই শিক্ষার্থীকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু কোনো দোষ, অপরাধ বা অভিযোগের সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া একজন শিক্ষার্থীকে কেন পুলিশের কাছে দেওয়া হবে—এটা আমার প্রশ্ন। সেখানে প্রক্টরও ছিলেন না। কোনো অভিযোগ ছাড়া একজন শিক্ষার্থীর ফোনও কেন প্রভোস্ট নিজের কাছে নিয়ে রাখবেন, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।’
অভিযোগের বিষয়ে জোহা হল ছাত্রদল সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদ বলেন, প্রথমত, ওই শিক্ষার্থীকে আমি আগে থেকে সেভাবে চিনতাম না। রাকসু নির্বাচনের সময় সর্বোচ্চ এক-দুবার তার সাথে ফোনে কথা হয়েছিল। তিন দিন আগে প্রভোস্টের রুমের সামনে তার সাথে আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে জানান, তিনি প্রায় তিন মাস ধরে অবৈধভাবে হলে ছিলেন এবং তার সিটটি নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখন তার থাকার জায়গা নেই, তিনি কী করবেন—এ বিষয়ে জানতে চান। আমি তাকে প্রভোস্ট স্যারের সাথে কথা বলতে বলি।
মারধরের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আরেকটি ভিডিও বার্তায় আমি তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছি, আমরা কি তোমাকে কোনো ধরনের মারধর করেছি? সে সেখানে স্পষ্টভাবে বলেছে, না, আমি কোনো মারধর করিনি। বরং সে আমার পা ধরে ক্ষমা চেয়েছে এবং বলেছে, সে ভুল করেছে, এমনটা করা তার উচিত হয়নি। সে আমাকে এই যাত্রায় ক্ষমা করে দিতে অনুরোধ করেছে এবং পরবর্তীতে আমাদের সাথে থাকার কথাও জানিয়েছে।
রাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ওই ছেলে যখন হল সভাপতির রুমে গিয়ে ধরা পড়ে, তখন হল ছাত্রদলের সভাপতি আমাকে ফোন করে জানতে চান, এখন কী করা উচিত। আমি তাকে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিই, কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন না ঘটে। যত রাতই হোক, তাকে হল প্রভোস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। আমি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিই, অন্যায়ের বিচার করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, তোমাদের নয়। কোনো ধরনের হয়রানি বা অপ্রীতিকর আচরণ ছাড়াই তাকে হল প্রশাসনের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করাই হবে দায়িত্বশীল আচরণের পরিচয়। আর তারা সেটাই করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি এখনো বিষয়টি জানতে পারিনি। যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা নিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সাথে বসে আলোচনা করেছে। সেখানে আমি উপস্থিত না থাকায় এখন কিছু বলতে পারছি না। প্রকৃত ঘটনা জেনে পরে জানাতে পারবো।


