মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের একটি নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আবেগ বা অনুমানের ওপর নির্ভর না করে প্রামাণ্য দলিল, সরকারি ও সামরিক নথি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য যাচাই-বাছাই করে এই তালিকা তৈরি করা হবে।
বুধবার (১২ আগস্ট) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের কৌশল নির্ধারণে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।
সভায় বিচ্ছিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা না করে বহুমুখী যাচাই-বাছাই ও গবেষণালব্ধ উপাত্তের সমন্বয়ে একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আলোচকরা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় প্রত্যক্ষদর্শী ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সাক্ষ্য দ্রুত সংরক্ষণ করা জরুরি। এ জন্য গ্রাম থেকে জেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রশাসন, গবেষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
রণাঙ্গনের সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নিহত সাধারণ মানুষ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও নারীদের তথ্যও যথাযথভাবে যাচাই ও সংরক্ষণের তাগিদ দেন বক্তারা। তালিকাভুক্ত প্রতিটি নামের পেছনে থাকা দলিল ও তথ্যের উৎস সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভাপতির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অনিয়ম এবং অমুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ রয়েছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরপরই প্রশাসনিক কাঠামো পুরোপুরি স্বাভাবিক না থাকায় পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই অনুমাননির্ভরভাবে শহিদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ঘোষণা করা হয়েছিল।
মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, বিগত কয়েক দশকে বিপুলসংখ্যক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করে স্বাধীনতার ইতিহাসকে কলঙ্কিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে এই অবস্থার অবসান ঘটিয়ে শহিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের সঠিক তালিকা প্রস্তুত করতে মন্ত্রণালয় অঙ্গীকারবদ্ধ।
মন্ত্রী বলেন, সঠিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ ও বীরাঙ্গনাদের তালিকা উপস্থাপন করা সম্ভব হলে ইতিহাসবিদদের কাছে ইতিহাস রচনার জন্য প্রামাণ্য তথ্য তুলে দেওয়া যাবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
সভায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কোনো অস্পষ্টতা বা বিভ্রান্তির সুযোগ থাকা উচিত নয়। প্রকৃত বীরদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ সর্বোচ্চ সতর্কতা, নিরপেক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে।
মতবিনিময় সভায় মন্ত্রণালয়ের সচিব আশরাফুল ইসলাম, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক আব্দুল হাই শিকদার এবং বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক আবদুল হাই সিদ্দিকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম বীর প্রতীক, মেজর জেনারেল (অব.) জামিল ডি আহসান বীর প্রতীক, মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান বীর উত্তম, সিপিবির সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক আহমেদ খান ও নইম জাহাঙ্গীরসহ অনেকে আলোচনায় অংশ নেন।


