এক বছরও পার হয়নি বাবার মৃত্যুর। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকেও হারালেন স্বজনরা। সোমবার রাতে বড় ভাইয়ের সাথে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছিলেন জুয়েল মাদবর। ব্যবসার কাজে নাটোর যাওয়ার পরিকল্পনাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনতে হবে, তা কল্পনাও করেননি কেউ। নাটোরের মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন শরীয়তপুরের জাজিরার ব্যবসায়ী জুয়েল মাদবর। তার আকস্মিক মৃত্যুতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া এলাকার নাটোর-পাবনা মহাসড়কের সরকারপাড়ায় যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে জুয়েল মাদবরসহ জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ী নিহত হন। দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ১৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
নিহত জুয়েলের বড় ভাই শাহজাহান মাদবর বলেন, গত রাতে জুয়েল ফোন করে বলল ভুট্টা কিনতে নাটোর যাবে। কীভাবে যাবি জানতে চাইলে বলল, সবাই মিলে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবে। সকালে ফোন পেয়ে শুনি ভাই আর নাটোরে মারা গেছে! রাতে যে ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো, সকালে শুনলাম সে আর নেই-এই বাস্তবতা কীভাবে মেনে নেব?
জীবিকার তাগিদে নাটোরের তাহেরপুর থেকে ভুট্টা কিনতে যাচ্ছিলেন জুয়েল। পণ্য কিনে বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও সেই যাত্রা আর শেষ হয়নি। জীবিত ফিরে আসার বদলে বাড়িতে পৌঁছেছে তার মৃত্যুর সংবাদ।
জুয়েলের চার বছরের মেয়ে রিদিতা ও দুই বছরের ছেলে সাইফান এখনো বোঝে না বাবার চিরবিদায়ের অর্থ। স্বজনদের কাছে তারা বারবার জানতে চাইছে, ‘বাবা কই, মা কখন আসবে?’ ছোট্ট দুই শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
স্বজনরা জানান, প্রায় এক বছর আগে জুয়েলের বাবা মারা যান। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম জুয়েলকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবারটি। গত দুই দশক ধরে জাজিরার কাজিরহাট এলাকায় ভুসামাল ও রড-সিমেন্টের ব্যবসা করতেন তিনি। তার আয়ের ওপরই নির্ভরশীল ছিল পুরো সংসার এবং দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ।
এ দুর্ঘটনায় জুয়েল মাদবর ছাড়াও জাজিরা উপজেলার আরও চার ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। তারা হলেন-ডুবিসায়বর মোল্যাকান্দি এলাকার সালাল মোল্যা, জাহান উদ্দিন মোল্যার ছেলে; ডুবিসায়বর কাজিরহাট এলাকার সোহাগ শিকদার, ইউনুস শিকদারের ছেলে; কাজিরহাট এলাকার ভুসামাল ব্যবসায়ী সামাদ ফকির এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার হলুদ ব্যবসায়ী শাহিন বেপারী, রাজ্জাক বেপারীর ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত পাঁচজনই দীর্ঘদিন ধরে কাজিরহাট বাজার ও আশপাশের এলাকায় ব্যবসা করে আসছিলেন। রাজশাহী ও নাটোরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন ও ধনিয়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কেনার পরিকল্পনা নিয়ে তারা একসাথে রওনা হয়েছিলেন।
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া এক যাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রাবিরতির পর বাসটির গতি নিয়ন্ত্রণে ছিল না। চালক তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকায় যাত্রীরা তাকে সতর্ক করে গতি কমানোর অনুরোধ জানান। তবে সেই অনুরোধের পরও কিছুক্ষণের মধ্যে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের সাথে বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
একসাথে পাঁচ ব্যবসায়ীকে হারিয়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে জাজিরায়। নিহতদের পরিবারে চলছে শোক আর আহাজারি। বিশেষ করে জুয়েলের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারানোর শোকের সাথে যুক্ত হয়েছে দুই অবুঝ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।


