১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর। ঢাকার ঐতিহাসিক রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। সেদিন তিনি নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’- বিএনপি গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পদ থেকে কীভাবে তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতির মূল স্রোতে চলে এলেন এবং নানা রাজনৈতিক পথপরিক্রমা পেরিয়ে দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও সুবিন্যস্ত ইতিহাস।
ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে রাজনীতির মাঠে
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকারে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে নানা অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তিনি নিজেকে একজন ‘সৈনিক’ হিসেবেই পরিচয় দিতেন এবং রাজনীতির সাথে কোনো সম্পর্ক নেই বলে উল্লেখ করতেন। তবে সময়ের প্রয়োজনে তার ভূমিকা বদলাতে শুরু করে। ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবু সাদত মো. সায়েমের পদত্যাগের পর তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৭৬ সালের মে মাসে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় তিনি নিজেকে ‘একজন শ্রমিক’ হিসেবে পরিচয় দেন। এরপর ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল ‘আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়’ নিয়ে ১৭ বা ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যা পরে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। একই বছর জনগণের আস্থা যাচাইয়ের জন্য অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল সমর্থন পাওয়ার পর তিনি রাজনীতিতে পুরোপুরি সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
জাগদল থেকে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট
সরাসরি নিজের নামে দল গঠনের আগে জিয়াউর রহমান একটি অনুগত রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেন। ১৯৭৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ বা ‘জাগদল’। তবে এটি বড় কোনো সাড়া ফেলতে ব্যর্থ হলে, ১৯৭৮ সালের ১ মে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত হয় ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’, যার চেয়ারম্যান হন স্বয়ং জিয়াউর রহমান। একই বছরের ৩ জুন ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করেন তিনি।
দল গঠন প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশু এবং একান্ত সচিব কর্নেল অলি আহমদ নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাতের বেলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ব্রিগেডিয়ার শিশুর দফতরে যাতায়াত করতেন। ভাসানী-ন্যাপের সভাপতি মশিউর রহমান যাদু মিয়াসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যোগাযোগ বাড়ান জিয়াউর রহমান। পাশাপাশি, গ্রামে গ্রামে হেঁটে সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শোনা এবং তাদের কাছাকাছি যাওয়ার মাধ্যমে তিনি জনসম্পৃক্ততা বাড়ান।
যেভাবে এলো ‘বিএনপি’ নাম
জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের অভিজ্ঞতার পর জিয়াউর রহমান একটি সুসংহত একক রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন। তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী দলটির নাম ‘জাস্টিস পার্টি’ রাখার প্রস্তাব করলেও জিয়াউর রহমান তাতে রাজি হননি; তিনি মনে করতেন দলের নামের সাথে ‘জাতীয়তাবাদী’ শব্দটি থাকা আবশ্যক। শেষ পর্যন্ত তিনিই ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি) নামটি চূড়ান্ত করেন।
১৯৭৮ সালের ২৮ আগস্ট ‘জাগদল’ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর ১ সেপ্টেম্বর রমনা রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন দলের নাম, গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বিএনপির গঠনতন্ত্র তৈরির প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি।
এদের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছাড়াও ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, নাজমুল হুদা, মওদুদ আহমদ এবং ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী (যিনি দলটির প্রথম মহাসচিব হয়েছিলেন)।
শুরুতে ১৮ জন এবং পরবর্তীতে ১৯ সেপ্টেম্বর ৭৬ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। নতুন এই দলে বাম, ডান ও মধ্যপন্থী বিভিন্ন মতের মানুষকে জায়গা দেওয়া হয় এবং রাজনীতিতে ৪৫ শতাংশ নতুন ও তরুণ মুখকে সামনে আনা হয়। দলটির প্রধান তিনটি রাজনৈতিক প্রস্তাব ছিল- বহুদলীয় গণতন্ত্র, স্বাধীনতার সুরক্ষা এবং দেশ ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে বর্তমান নেতৃত্ব
ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় যাত্রা শুরু করা বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার এবং পরবর্তীতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে দলটি ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
এরপর জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়ার দীর্ঘ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে দলটি বারবার ঘুরে দাঁড়ায় এবং ১৯৯১ ও ২০০১ সালে দুই দফা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সেই ধারাবাহিকতা পেরিয়ে বর্তমানে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান।
জাগদল থেকে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট এবং সবশেষে বিএনপি প্রতিষ্ঠার এই পুরো ইতিহাসটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।




