আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে অভিযুক্ত সাত স্বাস্থ্যকর্মীর সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছেন সরকারি আইনজীবীরা। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা দলের অব্যবস্থাপনা ও চরম অবহেলার কারণেই ২০২০ সালে মারা যান ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী এই তারকা।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) আর্জেন্টিনার আদালতে মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এ সাজা দাবি করেন আইনজীবীরা । তাদের অভিযোগ, অসুস্থ ম্যারাডোনাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়নি। তবে অভিযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর বুয়েনস এইরেসের উপকণ্ঠ তিগ্রেতে একটি ভাড়া বাড়িতে মারা যান ম্যারাডোনা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার কারণে অস্ত্রোপচারের দুই সপ্তাহ পর হৃদ্যন্ত্রের বিকলতা ও ফুসফুসে তরল জমে তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় গত এপ্রিল থেকে সাত স্বাস্থ্যকর্মীর বিচার চলছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও নার্সসহ চিকিৎসাসেবার সাথে যুক্ত অন্যরা।
আদালতে সরকারি আইনজীবীরা প্যাট্রিসিও ফেরাই বলেন, চিকিৎসকদের বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার কারণে অসুস্থ ম্যারাডোনা অসহায় অবস্থায় পড়েছিলেন। তাকে কার্যত ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, চিকিৎসকেরা নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেননি। ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক লিওপোলদো লুকের সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড চাওয়া হয়েছে। অন্য অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে চার থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দাবি করেছেন আইনজীবীরা।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ‘ডোলো ইভেনচুয়াল’ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। আর্জেন্টিনার আইনে এই ধারার অর্থ হলো, কোনো কাজের ফলে ক্ষতি হতে পারে জেনেও সেই কাজ চালিয়ে যাওয়া।
মামলার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো, অস্ত্রোপচারের পর ম্যারাডোনাকে হাসপাতালে না রেখে ব্যক্তিগত বাড়িতে চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসংগত ছিল। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, যে বাড়িতে তার চিকিৎসা চলছিল, সেখানে হাসপাতালের শয্যা, ডিফিব্রিলেটরসহ জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছিল না। এমনকি দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স পাওয়ার ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত ছিল না।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা আদালতে জানিয়েছেন, মৃত্যুর আগে ম্যারাডোনার শরীরে ফোলা, অস্বাভাবিক দ্রুত হৃদ্স্পন্দন ও শ্বাসকষ্টের মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এসব লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও চিকিৎসকেরা যথাযথ ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষের।
সহকারী আইনজীবী কসমে ইরিবারেন বলেন, ম্যারাডোনার মৃত্যু আকস্মিক ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক আগে থেকেই কিংবদন্তি এই ফুটবলারের শারীরিক অবস্থার অবনতির লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
তবে অভিযুক্ত চিকিৎসাকর্মীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, ম্যারাডোনার মৃত্যু আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিল না এবং তারা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবেই পালন করেছেন।
বৃহস্পতিবারের শুনানিতে ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর তোলা কয়েকটি ছবিও আদালতে উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এ সময় আদালতে উপস্থিত তার তিন মেয়ে ছবিগুলো দেখা এড়াতে মুখ ঢেকে ফেলেন।
মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলতে পারে। এরপর আদালত রায় ঘোষণা করবেন।
এর আগে, ম্যারাডোনার মৃত্যু নিয়ে প্রথম বিচারপ্রক্রিয়া গত বছর আড়াই মাস চলার পর বাতিল হয়ে যায়। মামলার এক বিচারক গোপনে এ-সংক্রান্ত একটি তথ্যচিত্র নির্মাণে অংশ নিয়েছিলেন বলে তথ্য প্রকাশের পর ওই বিচারপ্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছিল।



