বঙ্গোপসাগরের সুন্দরবন উপকূলের দুবলার চরে শুঁটকি মৌসুমের শুরুতেই বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়েছেন হাজারো জেলে। লঘুচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টি ও উত্তাল সাগরে ব্যাহত হচ্ছে মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন। মৌসুমের প্রথম দিন শুক্রবারই (৩০ অক্টোবর) ভারী বৃষ্টিতে ভেস্তে গেছে জেলেদের নানা প্রস্তুতি। সাগরে মাছ ধরতে যেতে না পারা, বসতঘর ও শুঁটকি তৈরির স্থাপনা নির্মাণে বাধা এবং রোদের অভাবে মাছ শুকাতে না পারায় শুরুতেই অনিশ্চয়তায় পড়েছে তাদের মৌসুমি জীবিকা।
শুধু আয়-রোজগার নয়, মহাজনদের কাছ থেকে দাদন ও ঋণ নিয়ে মৌসুমে আসা জেলেরা এখন বিনিয়োগ হারানো এবং ঋণ পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। অন্যদিকে, মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন ব্যাহত হলে সুন্দরবন বিভাগের নির্ধারিত ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
জেলেরা জানান, প্রতিবছর অক্টোবরের শেষ দিক থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সুন্দরবনের দুবলার চর, আলোরকোল, মেহের আলীসহ বিভিন্ন চরে চলে মাছ আহরণ ও শুঁটকি তৈরির কর্মযজ্ঞ। এ মৌসুমে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল থেকে হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবী এসব চরে সমবেত হন। মৌসুম শুরুর আগেই তারা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে চরে পৌঁছে অস্থায়ী বসতঘর, মাছ শুকানোর মাচা ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করেন। তবে এবার মৌসুমের শুরুতেই বৈরী আবহাওয়ায় তাদের সেই প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার রাত থেকে দুবলার চর ও আশপাশের এলাকায় শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টি শুক্রবারও অব্যাহত থাকে। এতে অনেক জেলে নতুন ঘর ও শুঁটকি তৈরির স্থাপনা নির্মাণ করতে পারেননি। উত্তাল সাগরের কারণে অনেকেই গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারেননি। কেউ কেউ উপকূলের কাছাকাছি মাছ ধরলেও রোদের অভাবে সেই মাছ শুকাতে পারছেন না। ফলে মৌসুমের শুরুতেই মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।
দুবলার চর জেলে পল্লীর সিও (ইনচার্জ) ফরেস্ট রেঞ্জার খলিলুর রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার রাত থেকে দুবলার চর এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে মৌসুমের শুরুতে আসা জেলেরা মাছ আহরণ ও বসবাসের জন্য নতুন ঘর তৈরিতে বাধার মুখে পড়েছেন। জেলেদের দুশ্চিন্তার বড় কারণ তাদের ঋণ ও বিনিয়োগ।
মাছ আহরণ, শুঁটকি তৈরি এবং চরে বসবাসের খরচ মেটাতে অনেকেই মহাজনদের কাছ থেকে দাদন ও ধারদেনা নিয়ে এসেছেন। তাদের আশা ছিল, মৌসুমের শুরু থেকেই মাছ ধরে শুঁটকি তৈরি ও বিক্রি করে আয় করবেন এবং সেই অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করবেন। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ায় মাছ আহরণ ও শুকানোর কাজ ব্যাহত হওয়ায় ঝুঁকিতে পড়েছে তাদের বিনিয়োগ। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধেও সংকটে পড়তে পারেন তারা।
এদিকে, শুঁটকি মৌসুমকে ঘিরে এবার ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বন বিভাগ। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন কমে গেলে রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মৌসুমের শুরুতেই এমন দুর্যোগে হতাশ হয়ে পড়েছেন দুবলার চরে আসা হাজারো জেলে। দ্রুত আবহাওয়ার উন্নতি না হলে তাদের মৌসুমি আয়-রোজগার, মহাজনের ঋণ পরিশোধ এবং বন বিভাগের রাজস্ব আদায়—সব ক্ষেত্রেই এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


