...|...|...

শিক্ষা

মেডিকেলে সুযোগ না পেয়ে বিচারকের স্বপ্ন, প্রথম ভাইভাতেই সফল আয়েশা

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১১:২৮
Shares
মেডিকেলে সুযোগ না পেয়ে বিচারকের স্বপ্ন, প্রথম ভাইভাতেই সফল আয়েশা

মেডিকেলে সুযোগ না পেয়ে বিচারকের স্বপ্ন, প্রথম ভাইভাতেই সফল আয়েশা। ছবি: সংগৃহীত

মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ না পেয়ে একসময় দ্বিতীয়বার চেষ্টা করার কথা ভেবেছিলেন জান্নাতুল আয়েশা। তখন এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে আইন বিভাগে ভর্তি হন তিনি। সেই সিদ্ধান্ত যে একদিন তাকে বিচারকের আসনে পৌঁছে দেবে, তখন হয়তো তা ভাবতেও পারেননি।

দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, মা-বাবার অনুপ্রেরণা, শিক্ষকদের দোয়া এবং নিজের ওপর অটুট বিশ্বাসকে সঙ্গী করে অবশেষে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সফল হয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী। প্রথমবারের জুডিশিয়ারি ভাইভাতেই সফল হয়ে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশ পেয়েছেন তিনি।

দুইশ জনের তালিকায় নিজের রোল নম্বর খুঁজে পাওয়ার মুহূর্তটি এখনো স্বপ্নের মতো মনে হয় জান্নাতুলের কাছে। যে স্বপ্ন পূরণের জন্য দিনের পর দিন পড়ার টেবিলে বসেছেন, কখনো একাকী কেঁদেছেন, কখনো নিজেকে নতুন করে প্রস্তুত করেছেন- অবশেষে সেই স্বপ্নই বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

তবে তার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক পথচলা। শৈশবের কঠোর অনুশাসন থেকে শুরু করে মেডিকেলে সুযোগ না পাওয়ার হতাশা, সেখান থেকে আইন পড়ার সিদ্ধান্ত এবং পরে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন—প্রতিটি ধাপেই ছিল নতুন চ্যালেঞ্জ।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রাকুদিয়া গ্রামে নানাবাড়িতে জন্ম জান্নাতুল আয়েশার। তবে মা-বাবার কর্মস্থলের কারণে তার স্কুল ও কলেজজীবন কেটেছে চট্টগ্রামে। ছোটবেলায় বাবার কাছেই পড়াশোনার হাতেখড়ি। লেখাপড়ার পাশাপাশি হাতের লেখার প্রতিও বাবার ছিল বিশেষ নজর।

জান্নাতুল বলেন, আমার জন্ম বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রাকুদিয়া গ্রামে, নানাবাড়িতে। মা-বাবার কর্মস্থলের সুবাদে স্কুল ও কলেজজীবন কেটেছে চট্টগ্রামে। পড়াশোনার হাতেখড়ি বাবার হাত ধরে। ছোটবেলায় বাবা প্রচুর লিখাতেন। হাতের লেখা সুন্দর, পরিষ্কার ও নির্ভুল করার বিষয়ে তার কঠোর শাসন ছিল। পরবর্তী জীবনে সেটি আমার অনেক কাজে এসেছে।

২০১৭ সালে মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ না পাওয়ার পর কিছুটা অনিশ্চয়তায় পড়ে যান জান্নাতুল। তখন দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এ সময় তার এক বড় ভাই তাকে আইন বিভাগে পড়ার পরামর্শ দেন এবং মা-বাবাকেও আইন পড়ার পর সম্ভাব্য ক্যারিয়ার সম্পর্কে বোঝান। এরপরই আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

জান্নাতুল বলেন, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উত্তম পরিকল্পনাকারী। আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পেছনে একটি গল্প আছে। ২০১৭ সালে মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ না পাওয়ার পর ভেবেছিলাম দ্বিতীয়বার প্রস্তুতি নেব। তখন আমার একজন দুলাভাই আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি আমার মা-বাবাকেও আইন পড়ার পর সম্ভাব্য ক্যারিয়ার সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। পরে আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে যাই।

আইন বিভাগে পড়াশোনা শুরু করার পর ধীরে ধীরে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন জান্নাতুল। সেই লক্ষ্য পূরণে শুরু করেন দীর্ঘ প্রস্তুতি। পড়াশোনার পুরো সময়জুড়েই মা-বাবার সহযোগিতা ছিল তার অন্যতম বড় শক্তি।

তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালার পরেই আমার সাফল্যে সবচেয়ে বড় অবদান আমার মা-বাবার। পড়ার টেবিলে খাবার-পানিটুকুও তারা এগিয়ে দিতেন। দিনরাত মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়েছেন।

শুধু মা-বাবাই নন, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পাওয়া বন্ধুদেরও নিজের পথচলার অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

জান্নাতুল বলেন, আমার মা-বাবা আমার স্বপ্নকে লালন করেছেন এবং আমাকে সহযোগিতা করেছেন। স্কুল-কলেজ এবং সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের দোয়া ও শিক্ষা আমাকে আলোকিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে খুব সুন্দর একটি বন্ধুমহল পেয়েছি। বিশেষ করে হালিমাতুস সাদিয়া, যিনি ১৭তম বিজেএসে মেধাক্রমে প্রথম হয়েছিলেন, এবং তার পরিবার আমাকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।

প্রস্তুতির ক্ষেত্রে প্রতিদিন নির্দিষ্ট কত ঘণ্টা পড়তে হবে- এমন কোনো নিয়ম নিজের জন্য তৈরি করেননি জান্নাতুল। বরং প্রতিদিনের পড়াশোনার লক্ষ্য নির্ধারণ করে তা শেষ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি জানান, বেয়ার অ্যাক্টকে ভিত্তি করে প্রস্তুতি নিয়েছেন। প্রয়োজন মনে হলে বিভিন্ন বই সংগ্রহ করে সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেয়ার অ্যাক্টের সাথে মিলিয়ে নিয়েছেন। পুরো জুডিশিয়ারি সিলেবাসকে ভাগ করে ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা করতেন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকত এবং সেটি শেষ করতে যত সময় প্রয়োজন হতো, ততক্ষণই পড়তেন।

১৮তম বিজেএস ছিল জান্নাতুলের প্রথম জুডিশিয়ারি ভাইভা। প্রথমবারেই সফল হয়ে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।

জান্নাতুল বলেন, ১৮তম জুডিশিয়ারিই ছিল আমার প্রথম ভাইভা। আলহামদুলিল্লাহ, প্রথমবারেই সফল হয়েছি।

ভাইভার প্রস্তুতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ভাইবার প্রথম এবং প্রধান বিষয় হলো নমনীয়তা, ভদ্রতা, আদব ও ভাবভঙ্গি। ১৮তম জুডিশিয়ারির ভাইভা প্রস্তুতির শুরুতেই কীভাবে বিনয়ের সাথে সরি বলতে হয়, সেটি শিখে নিয়েছিলাম। পাশাপাশি বেয়ার অ্যাক্ট ও লিখিত পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রিভিশন দিয়েছি। বিভিন্ন ভাইভা অভিজ্ঞতা পড়েছি এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে কীভাবে উত্তর দেব, তা নিজের মধ্যে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি।

বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখা তরুণদের উদ্দেশে জান্নাতুলের পরামর্শ, ব্যর্থতায় ভেঙে পড়া যাবে না। প্রয়োজনে প্রস্তুতির পদ্ধতি বদলাতে হবে, কিন্তু লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, কখনো আশা ও আত্মবিশ্বাস হারাবেন না। নিজেকে বারবার বলুন, আমি পারব, আমাকে দিয়েই হবে। নিরলস চেষ্টা করে যান। যদি সফলতা না আসে, তাহলে পথ পরিবর্তন করুন, লক্ষ্য নয়। আমি এই কথাগুলো ধারণ করেই এতদূর আসতে পেরেছি।

সহকারী জজ হিসেবে ভবিষ্যতে দেশের বিচারব্যবস্থায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে চান জান্নাতুল। তার কাছে বিচারকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং বিচারপ্রার্থী মানুষের আস্থা ধরে রাখা।

জান্নাতুল বলেন, প্রতিটি মানুষ যদি তার নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন, তাহলে দেশের জন্য সেটিই যথেষ্ট। একজন বিচারক হিসেবে আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার প্রদান করাই আমার মুখ্য দায়িত্ব। বিচারপ্রার্থী মানুষের জন্য আমি এতটুকুই নিষ্ঠার সাথে করতে চাই, যেন তারা ন্যায়বিচার এবং দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল হন।