ভোলা শহর ও আশপাশের এলাকায় দিন দিন বাড়ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা। এসব যানবাহনের অনেকগুলোর ফিটনেস নেই। শহরের প্রধান সড়ক, বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অবাধে চলাচল করছে এসব যানবাহন। নির্ধারিত স্ট্যান্ডের বাইরে সড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা, যত্রতত্র পার্কিং এবং হঠাৎ সড়ক ঘুরিয়ে দেওয়ার কারণে বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। একই সাথে চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, নির্ধারিত রুট ও যানবাহনের বৈধতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
তবে ভোলা শহর ও জেলায় বর্তমানে মোট কতটি ইজিবাইক চলাচল করছে, এর মধ্যে কতটি পৌরসভার লাইসেন্সপ্রাপ্ত, কতটি নতুন করে সড়কে নেমেছে এবং কতটি অনুমোদনহীন-এর কোনো সমন্বিত হালনাগাদ তথ্য নেই। ফলে বৈধ ও অবৈধ অটোরিকশার প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
দুই বছরে প্রায় ১২০০ ইজিবাইকের লাইসেন্স
ভোলা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের দিকে প্রায় ১ হাজার ২০০ অটোরিকশা লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে নতুন করে অটোরিকশার লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, এরপরও যেসব অটোরিকশা নতুন করে সড়কে নামছে, সেগুলো অনুমোদনহীনভাবে চলাচল করছে। বর্তমানে নতুন লাইসেন্স দেওয়ার অনুমতি নেই। তবে লাইসেন্সবিহীন অটোরিকশার সঠিক সংখ্যা পৌরসভার কাছে নেই।
অবৈধ অটোরিকশা তৈরির কারখানার বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে পৌরসভা ব্যবস্থা নেবে।
পৌরসভার নির্ধারিত পার্কিংয়ের জায়গা থাকা সত্ত্বেও চালকেরা দ্রুত যাত্রী পাওয়ার আশায় বিভিন্ন সড়ক ও মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন বলেও জানান তিনি। এতে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
শোরুম-কারখানার ১৭টির পৌর লাইসেন্স
ভোলা পৌরসভার লাইসেন্স শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট লাইসেন্স ইন্সপেক্টর মো. রাকিব জানান, শহরে ইজিবাইকের শোরুম ও কারখানা মিলিয়ে ১৭টি প্রতিষ্ঠানের পৌর লাইসেন্স রয়েছে। এর বাইরে আরও প্রতিষ্ঠান থাকলেও তাদের অনেকের লাইসেন্স নেই বলে জানান তিনি।
লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান বা কারখানার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তবে কোনো শোরুম বা কারখানার পৌরসভা থেকে ব্যবসায়িক লাইসেন্স থাকা এবং ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বিক্রি হওয়া অটোরিকশার সড়কে চলাচলের অনুমোদন পাওয়া দুটি আলাদা বিষয়। ফলে ব্যবসায়িক লাইসেন্স থাকলেই ওই প্রতিষ্ঠানের তৈরি বা বিক্রি করা প্রতিটি অটোরিকশা সড়কে চলাচলের বৈধতা পেয়েছে-এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তিন মাসে দুর্ঘটনায় নিহত ৭, আহত ৫
প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন মাসে ভোলায় অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের সংঘর্ষে অন্তত ৭ জন নিহত এবং ৫ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার সবগুলো শুধু ইজিবাইকের কারণে ঘটেছে-এমনটি বলা যায় না। তবে অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষ, যত্রতত্র থামানো এবং সড়কে বিশৃঙ্খল চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু চালকের অদক্ষতা, অতিরিক্ত গতি, হঠাৎ সড়কের মাঝখানে থেমে যাত্রী ওঠানামা এবং কখনো কখনো উল্টো পথে চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার কারণ বলে জানান তারা।
তবে কোনো দুর্ঘটনার জন্য অটোরিকশাকে সরাসরি দায়ী করার আগে প্রতিটি ঘটনার কারণ তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চালকের দক্ষতা, যানবাহনের গতি, সড়কের অবস্থা, পথচারীর চলাচলসহ বিভিন্ন বিষয়ও দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
তিন মাসে ৯০ অটোরিকশাকে জরিমানা
ভোলা ট্রাফিক পুলিশের টিআই আজিজুল করিম জানান, জুন, জুলাই ও আগস্ট-এই তিন মাসে যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে প্রায় ৯০টি অটোরিকশাকে জরিমানা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আনুমানিক ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ইজিবাইক ও অটোরিকশার কারণে সৃষ্ট যানজটের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা সভায়ও আলোচনা হয়েছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে ভোলা পৌরসভাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা সমন্বয় করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
টিআই আজিজুল করিম আরও বলেন, যেভাবে অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে শহরে যানজটও বাড়ছে। যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ করে পৌরসভার নির্ধারিত এলাকায় এসব যানবাহনের চলাচল সীমাবদ্ধ রাখা গেলে যানজট কমানো সম্ভব।
সড়কে বাড়ছে যানজট
ভোলা শহরের ব্যস্ত সড়ক ও বাজার এলাকায় অটোরিকশার চাপ সবচেয়ে বেশি। রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানো, চলন্ত সড়কে থেমে যাত্রী নামানো এবং একই স্থানে একাধিক অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকার কারণে যান চলাচলে ধীরগতি তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ, ব্যবসায়ী, রোগী ও সাধারণ যাত্রীদের চলাচলে ভোগান্তি বাড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
চার্জিংয়ে প্রায় ৫০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ
ইজিবাইকের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে ব্যাটারি চার্জের জন্য বিদ্যুতের ব্যবহারও বাড়ছে। ভোলা বিদ্যুৎ সরবরাহ, ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফ জানান, ইজিবাইক চার্জ দেওয়ার জন্য শহরে বাণিজ্যিকভাবে অনুমোদিত প্রায় ২৫টি মিটার বা সংযোগ রয়েছে। প্রতিটি সংযোগে প্রায় ১০ কিলোওয়াট করে লোড রয়েছে।
তিনি বলেন, আগে অটোরিকশা চার্জের জন্য প্রায় ২০০ কিলোওয়াটের মতো লোড প্রয়োজন হতো। বর্তমানে শহরে অটোরিকশা চার্জে প্রায় ৫০০ কিলোওয়াট লোড নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ইজিবাইক চার্জে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় বর্তমানে ইজিবাইক চার্জে বছরে ঠিক কত ইউনিট বিদ্যুৎ বেশি ব্যবহার হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।
অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও নজরদারি
ইজিবাইক চার্জিং গ্যারেজে অনুমোদিত সংযোগের বাইরে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। অবৈধ সংযোগ থাকলে তা বিদ্যুৎ বিভাগের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফ বলেন, ভোলায় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রয়োজন সমন্বিত জরিপ ও ব্যবস্থা
অটোরিকশা এখন ভোলার সাধারণ মানুষের স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। ফলে একেবারে বন্ধ করার পরিবর্তে কোন যান বৈধ, কোনটি অনুমোদনহীন-তা চিহ্নিত করে নিয়মের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রথমে ভোলায় চলাচলকারী অটোরিকশার প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এরপর বৈধ কাগজপত্র যাচাই, চালকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অনুমোদন, নির্দিষ্ট রুট ও স্ট্যান্ড নির্ধারণ এবং যত্রতত্র পার্কিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
একই সাথে অটোরিকশা তৈরির ও বিক্রির প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক লাইসেন্স, যানবাহনের সড়কে চলাচলের অনুমোদন, চার্জিং গ্যারেজের বৈধতা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ-প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলা পৌরসভা, জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ ও বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা গেলে শহরে কতটি ইজিবাইক বৈধভাবে চলছে আর কতটি নিয়মের বাইরে রয়েছে, তার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী রুট, স্ট্যান্ড, পার্কিং, চালকের যোগ্যতা এবং যানবাহনের কাগজপত্রের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।

