দীর্ঘ দেড় দশকের টালমাটাল পরিস্থিতিতে বাংলাদশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চালিকাশক্তি ছিল সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনগুলো। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে এখন সহযোগী সংগঠনের দিকে মনোযোগ দিয়েছে দলটি। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সারাদেশে এই সংগঠনগুলোকেও শক্তিশালী করতে চায় বিএনপি। সংগঠনগুলোর গুরুদায়িত্ব দিতে ছাত্রদল, কৃষকদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের জন্য খোঁজা হচ্ছে পরীক্ষিত, ত্যাগী ও ক্লিন ইমেজের নতুন মুখ।
সূত্রে জানা গেছে, ফ্যাসীবাদ বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের পুরস্কারস্বরূপ এই তিন সংগঠনের নেতাদের অনেকে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে হয়েছেন সংসদ সদস্য, স্থান পেয়েছেন মন্ত্রিসভাতেও। শিগগিরই এই তিন সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে পারে এমন ইঙ্গিত দিয়েছে দলের হাইকমান্ড। আর এতে নড়েচড়ে বসেছে সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পদপ্রত্যাশীরা। নতুন নেতৃত্বে আসতে শুরু করেছেন দৌড়ঝাঁপ, হাজিরা দিচ্ছেন বিএনপি ও সংগঠনের সাবেক শীর্ষ নেতাদের দরবারে।
বিএনপি নেতারা বলেন, বিগত সরকারের অত্যাচার, হামলা-মামলায় বিপর্যস্ত ছিল দল, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বছরের পর বছর সম্মেলন হয়নি অনেক শাখায়, এমনকি পূর্ণাঙ্গ কমিটিও দেওয়া সম্ভব হয়নি। মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনগুলোতে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব আনার জোর প্রস্তুতি চলছে। পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের দিয়ে এসব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনগুলো ঢেলে সাজাতে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলের বিভিন্ন ইউনিট, সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের সম্মেলন ও নতুন কমিটি গঠন চলমান প্রক্রিয়া। এজন্য চেয়ারম্যান তারেক রহমান দায়িত্বশীল নেতাদের নিয়ে কাজ করছেন। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যেই অঙ্গসংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে।
সূত্র জানায়, বিএনপির ১১টি সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের মধ্যে ১০টিরই মেয়াদ শেষ। সহযোগী সংগঠনের অনেক শীর্ষ নেতা হয়েছেন এমপি, দায়িত্ব পেয়েছেন মন্ত্রণালয়ের। ফলে নেতারা দলের চেয়ে সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তাছাড়া আওয়ামী লীগ আমলে সরকারে বিলীন হয়ে গিয়েছিল দল- এখান থেকেও শিক্ষা নিয়ে সংগঠন ও সরকার আলাদা রাখতে চায় বিএনপি। অপরদিকে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সামনে অত্যন্ত কঠিন সময় অপেক্ষা করছে বলে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সতর্ক করেছেন। সেজন্য সংগঠনকে গতিশীল রাখতে বিএনপির পক্ষ থেকে আগেভাগেই উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
নেতারা বলেন, সহযোগী সংগঠনের মধ্য কৃষক দলের অবস্থা সবচেয়ে সঙ্গীন- কারণ এই সংগঠন থেকেই বেশি নেতা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে ২০ মাসের বেশি সময় আগে। তিন বছর মেয়াদী কৃষক দলের সর্বশেষ কমিটি গঠিত হয়েছে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সচিব পদমর্যাদায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সংঠনের সভাপতি হাসান জাফির তুহিন। সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল নিজেও নির্বাচিত হয়েছেন এমপি। একই কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক মোশাররফ হোসেন, ফজলে হুদা নির্বাচিত হয়েছেন সংসদ সদস্য। ষুগ্ম সম্পাদক মাহমুদা হাবিবাও সংসদ সদস্য।
এসব বিবেচনায় নতুন কমিটির মাধ্যমে কৃষক দলকে চাঙ্গা করতে দাবি জোরালো হয়েছে। নতুন নেতৃত্বের আলোচনায় সভাপতি হিসেবে আছেন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক কৃষিবিদ শামীমুর রহমান ও সহ-সভাপতি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আলোচনায় আছেন সাবেক ছাত্রনেতা বিএনপির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আমিরুজ্জান খান শিমুল ও কৃষক দলের যুগ্ম সম্পাদক কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ।
এ বিষয়ে আমিরুজ্জামান শিমুল টাইমস টুডেকে বলেন, দলের হাইকমান্ড যখন যে দায়িত্ব দিবে সেটাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পালন করতে সর্বদাই প্রস্তুত আছি।
এছাড়া আরো আলোচনায় আছেন কৃষক দলের তিন যুগ্ম সম্পাদক ইন্জিনিয়ার টি এস আইয়ুব, মোশাররফ হোসেন ও কৃষিবিদ শাহাদত হোসেন বিপ্লব।
অপরদিকে, স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে নয় মাস আগে। তিন বছর মেয়াদী কমিটি গঠিত হয় ২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সভাপতি এসএম জিলানী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আর সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান সংসদ সদস্য হবার সঙ্গে স্থান পেয়েছেন মন্ত্রিসভায়ও। এ অবস্থায় সংগঠনটির নতুন কমিটির আলোচনা চলছে জোরেসোরে।
জানা গেছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটিতে সভাপতি হিসেবে সংগঠনের বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াছিন আলী ও ফখরুল ইসলাম রবিন, এবং সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসানের নামও শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক কাজী মুক্তার হোসেন, রফিকুল ইসলাম, ফয়েজ উল্লাহ ফয়েজ, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক কাজী আবদুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ফরিদ হোসেন, দক্ষিণের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন, সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন।
তবে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণের ও নির্বাহী কমিটির সদস্য ফজলুর রহমান খোকনের নাম জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষপদে।
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ টাইমস টুডেকে বলেন, দায়িত্ব দেওয়া না দেওয়া তো দলের সিদ্ধান্ত। দল যদি চায় এবং দায়িত্ব দেয় তবে তা পালন করব।
বিএনপির নেতৃত্বের আঁতুড়ঘর হলো ছাত্রদল। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনে বিএনপির এই ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। এই ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে তিন মাস। ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ঘোষণা করা হয় আংশিক কমিটি। এজন্য দলটির নতুন কমিটি ঘোষণার দাবিও জোরালো হয়েছে। এই সংগঠনের সহসভাপতি মানছুরা আক্তার সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।
সংগঠনটির দুই শীর্ষপদের আলোচনায় রয়েছে ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, খোরশেদ আলম সোহেল, সাফি ইসলাম ও জাফর আহমেদের নাম। কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, ফারুক আহমেদ, মোস্তাফিজ ইসলাম রুবেল, মোস্তাফিজুর রহমান, শরীফ প্রধান শুভ, তরিকুল ইসলাম তরিক ও সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সহসভাপতি মাসুম বিল্লাহ, সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকও সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হতে চান।
এছাড়াও শীর্ষ দুই পদের জন্য যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম রনি, তারেক হাসান মামুন, ইব্রাহিম খলিল, রাজু আহমেদ, সাদ্দাম হোসেন এবং ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনের নামও রয়েছে আলোচনায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতি সৈকত মোর্শেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক নূর আলম ভূঁইয়া ইমনও সংগঠনের শীর্ষপদ পেতে চালাচ্ছেন নানামুখী তৎপরতা।
ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া এবং যুগ্ম সম্পাদক শ্যামল মালুমও সংগঠনের নতুন কমিটির শীর্ষ দুই পদের আলোচনায় রয়েছেন। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান আবিদও সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী। আবিদ ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী ছিলেন।
সভাপতি পদপ্রত্যাশী ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান টাইমস টুডেকে বলেন, বর্তমান কমিটির মেয়াদ যেহেতু শেষ; এজন্য তৃণমূল থেকে সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মুখিয়ে আছে নতুন কমিটি বা সম্মেলনের জন্য। নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নিবেন কবে ও কাদের দিয়ে কমিটি করবেন। মাঠপর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা আছে, অতীতের আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে পরীক্ষিত- এমন নেতৃত্বই চায় ছাত্রদলের সকল নেতাকর্মী।

