...|...|...

রাজশাহী

বাড়িভিটা শেষ সম্বল বিক্রি করেও থামেনি নাঈমের বাঁচার লড়াই

জয়পুরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৭ জুলাই ২০২৬, দুপুর ১২:১২ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬, রাত ১০:২৭
Shares
বাড়িভিটা শেষ সম্বল বিক্রি করেও থামেনি নাঈমের বাঁচার লড়াই

বন্ধুরা যখন স্কুলের মাঠে দৌড়ায়, তখন দূরে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা দেখে নাঈম। ইচ্ছা থাকলেও দৌড়াতে পারে না। কিছুক্ষণ হাঁটলেই হাঁপিয়ে ওঠে, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে শরীর কাঁপতে শুরু করে। জন্মের মাত্র ২৮ দিন পর ধরা পড়ে তার হৃদযন্ত্রে ফুটো। সেই থেকে হাসপাতাল, চিকিৎসা আর অনিশ্চয়তার সাথে বেড়ে ওঠা ১০ বছরের এই শিশুর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন-একদিন সুস্থ হয়ে সবার মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করা।

মো. সাজ্জাদ ইসলাম নাঈমের বাড়ি জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের ধুনট গ্রামে। ২০১৫ সালে জন্ম নেওয়া নাঈম স্থানীয় বিনইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। 

নাঈমের বাবা মো. নুর মোহাম্মদ একসময় ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতেন। কিন্তু ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাতে ৩০ হাজার টাকায় সেই ভ্যান বিক্রি করতে হয়েছে। এখন তিনি দিনমজুরের কাজ করেন। মা মোছাম্মৎ সেলিনা বেগম সংসারের কাজের ফাঁকে সেলাই মেশিনে কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে।

পরিবার জানায়, জন্মের ২৮ দিনের মাথায় চিকিৎসকেরা নাঈমের হৃদযন্ত্রে ফুটো শনাক্ত করেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে তাকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেওয়া হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের বেঙ্গালুরুতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের হিসাবে প্রয়োজন প্রায় আট লাখ টাকা।

এই টাকার ব্যবস্থা করতে গিয়ে পরিবার বিক্রি করেছে বাড়ির এক শতক জমি, তিনটি গরু এবং জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ভ্যান। সব মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকা জোগাড় হলেও বাকি অর্থের অভাবে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।

মা সেলিনা বেগম বলেন, ‘ছেলেকে বাঁচানোর জন্য যা ছিল, সব বিক্রি করেছি। এখন আর কিছুই নেই। তবু চাই, আমার ছেলেটা সুস্থ হয়ে আমাদের সামনে বেঁচে থাকুক।’

নাঈমের দাদা মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘নাতির চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমরা প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছি। এখন মানুষের সহযোগিতা ছাড়া আর কোনো পথ দেখছি না।’

নাঈমের স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘নাঈম খুবই শান্ত, বিনয়ী ও মেধাবী শিক্ষার্থী। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা দিন দিন জটিল হচ্ছে। দ্রুত অপারেশন না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।’

সহপাঠী মো. হোসেন বলে, ‘আমরা সবাই একসাথে খেলি। কিন্তু নাঈম বেশি সময় খেলতে পারে না। অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যায়। আমরা চাই, ও দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের সাথে আগের মতো খেলুক।’

নিজের কথা বলতে গিয়ে নাঈমের কণ্ঠে ধরা পড়ে এক শিশুর সরল আকাঙ্ক্ষা। সে বলে, ‘বন্ধুরা যা পারে, আমি তা পারি না। একটু দৌড়ালেই শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আমি সুস্থ হতে চাই। সবার মতো খেলতে চাই, পড়তে চাই।’

একটি শিশুর বেঁচে থাকার লড়াইয়ে একটি পরিবার ইতিমধ্যে হারিয়েছে তাদের প্রায় সব সঞ্চয়। তবু থেমে নেই তাদের আশা। সেই আশার নাম—সময়মতো চিকিৎসা। আর সেই চিকিৎসার পথ খুলে দিতে প্রয়োজন সমাজের সহমর্মী মানুষের হাত।