...|...|...

অন্যান্য

প্লেনের জানালা কেন এত জটিল আর ঝুঁকিপূর্ণ?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:২২
Shares
প্লেনের জানালা কেন এত জটিল আর ঝুঁকিপূর্ণ?

ছবি: সংগৃহীত

প্লেনের জানালা নিছক কোনো সাধারণ কাচ বা প্লাস্টিকের টুকরো নয়। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এটি তৈরি হয় অত্যন্ত জটিল প্রকৌশল ও কঠোর বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়ায়। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আকাশে ওড়ার সময় তীব্র বায়ুচাপ, চরম তাপমাত্রা এবং পাখির আঘাতের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম করেই তৈরি করা হয় এই জানালাগুলো।

গত মে মাসের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থিত এভিয়েশন যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জিকেএন অ্যারোস্পেসের একটি রাসায়নিক সংরক্ষণাগারে হঠাৎ অস্বাভাবিক হারে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে। ৭ হাজার গ্যালনের বেশি বিষাক্ত রাসায়নিক ধারণক্ষমতার এই ট্যাংকে মজুত ছিল মিথাইল মেথাক্রিল্যাট বা এমএমএ নামের যৌগ, যা মূলত প্লাস্টিক উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় এবং ত্বক ও ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর।

তাপমাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছালে ট্যাংক বিস্ফোরণের আশঙ্কা দেখা দেয়, যা আশপাশের জনবসতিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে। প্রকৃত তাপমাত্রা কত ছিল তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি, কারণ ট্যাংকের তাপমাত্রা পরিমাপক যন্ত্রের সর্বোচ্চ সীমাই ছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ঝুঁকি এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে গার্ডেন গ্রোভ শহরের ৫০ হাজারেরও বেশি বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ট্যাংকটি ঠাণ্ডা করতে উপর থেকে ক্রমাগত পানি ছিটাতে থাকেন। স্থানীয় ফায়ার প্রধানের তথ্যানুসারে, এক পর্যায়ে ট্যাংকটি ফুলে উঠেছিল, তবে শেষ পর্যন্ত কোনো বিস্ফোরণ ঘটেনি।

ঘটনার প্রায় তিন মাস পর আগস্টে জিকেএন ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে ১০ কোটি ডলারের একটি ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি ঘোষণা করে, যা ওই সময় সরিয়ে নেওয়া বাসিন্দাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়।

এই ঘটনার জেরে প্ল্যান্টটিতে প্লেনের জানালা তৈরির কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ হয়ে যায় এবং এখনো তা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। জিকেএনের ব্রিটিশ মূল প্রতিষ্ঠান মেলরোজ ইন্ডাস্ট্রিজের তথ্যমতে, গার্ডেন গ্রোভ প্ল্যান্টের উৎপাদন এখনো স্বাভাবিক সময়ের প্রায় অর্ধেক পর্যায়ে রয়েছে, যদিও আগামী ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ণ উৎপাদনে ফেরার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি জিকেএন। তবে এভিয়েশন বিশ্লেষক মারিসা গার্সিয়ার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সরবরাহে সক্ষম প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিশ্বে হাতে গোনা, ফলে কোথাও কোনো বিঘ্ন ঘটলে তা পুরো সরবরাহব্যবস্থাকেই নাড়িয়ে দেয়।

বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং জানিয়েছে, তারা এই প্রভাব কমাতে পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং একে পুরো শিল্প খাতের সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে এয়ারবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ্য করছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যারোডাইনামিক অ্যাডভাইজরির বিশেষজ্ঞ মাইক স্টেনজেলের ভাষ্যমতে, বর্তমানে বিভিন্ন এয়ারলাইন যে গতিতে নতুন প্লেন চাইছে, সেই গতিতে তা হাতে পাচ্ছে না, ফলে পুরনো প্লেনগুলোই দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে তারা। তার মতে, প্লেনের জানালা তৈরির খাতে কঠোর নিয়মকানুনের কারণে নতুন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের বাজারে প্রবেশও সহজ নয়, আর নতুন সরবরাহকারীর ওপর আস্থা তৈরি করতেও যথেষ্ট সময় প্রয়োজন হয়। এ কারণে বিমান নির্মাতা ও তাদের যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীদের মধ্যে একধরনের ভারসাম্য রক্ষার জটিল প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

ফরাসি প্রতিষ্ঠান স্যঁ-গোবা অ্যারোস্পেসের জেনারেল ম্যানেজার জঁ-এরিক ভার্মন্ট জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান মূলত বাণিজ্যিক ও আঞ্চলিক প্লেন এবং হেলিকপ্টারের জানালা তৈরিতে মনোযোগ দেয়। এভিয়েশন পরিভাষায় প্লেনের জানালাকে বলা হয় ‘ট্রান্সপারেন্সিজ’। কেবিনের যাত্রী আসনের পাশের ডিম্বাকৃতি জানালাগুলো তৈরি হয় অ্যাক্রিলিক শিট কেটে নির্দিষ্ট আকার দেওয়ার মাধ্যমে। স্যঁ-গোবার একজন মুখপাত্র জানান, জিকেএনের মতো তাদের প্রতিষ্ঠানে এমএমএ সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াজাত করা হয় না, বরং তারা সরাসরি পলিমারাইজড এমএমএ বা অ্যাক্রিলিক শিট কিনে নেয়।

ভার্মন্ট আরও জানান, যাত্রীদের বাইরের দৃশ্য আরও ভালোভাবে উপভোগ করার সুযোগ দিতে বিমান নির্মাতারা এখন বড় আকারের জানালা চাইছেন, যা প্লেনের একটি বড় বাণিজ্যিক আকর্ষণও বটে। তবে বড় জানালা ছোট জানালার মতো একই মাত্রার মজবুত কি না, তা নিশ্চিত করতে বাড়তি পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। এ জন্য স্যঁ-গোবা স্বাভাবিক উড্ডয়ন-চাপের চেয়ে বহুগুণ বেশি চাপ প্রয়োগ করে জানালার মান যাচাই করে। কেবিনের জানালাগুলো দুই স্তরবিশিষ্ট, এবং একটি স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জানালাটি টিকে থাকতে পারে কি না, তাও পরীক্ষা করা হয়।

ভার্মন্টের ভাষ্যমতে, ককপিটের জানালা কেবিনের জানালার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রযুক্তিতে তৈরি। এগুলো সাধারণ কাচ দিয়ে তৈরি হলেও পটাশিয়াম যুক্ত করে রাসায়নিকভাবে মজবুত করা হয়—এই প্রক্রিয়ায় কাচের ছোট সোডিয়াম আয়নের জায়গায় বড় পটাশিয়াম আয়ন প্রতিস্থাপিত হয়, যা কাচের আণবিক গঠনকে অধিক শক্তিশালী করে তোলে।

আধুনিক কিছু বিমানে জ্বালানি সাশ্রয় ও নকশাগত মসৃণতার জন্য বাঁকানো ককপিট জানালাও ব্যবহৃত হচ্ছে, যদিও সামান্য বিকৃতি বা ত্রুটি সহজেই পাইলটের চোখে ধরা পড়ে বলে এ ধরনের জানালা তৈরি করা তুলনামূলক কঠিন এবং তাই এতে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা চালানো হয়।

ভার্মন্ট জানান, ককপিটের জানালা পাখির আঘাতের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে, আর এক্ষেত্রে মূল সমস্যা তৈরি করে পাখির নয়, বরং প্লেনের নিজের গতিই। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় স্যঁ-গোবা অসংখ্য সিমুলেশন ও বাস্তবভিত্তিক পরীক্ষা চালায়, যেখানে মাঝারি আকারের পাখির আঘাতের অনুরূপ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। তার ভাষায়, শিলাবৃষ্টি বা বড় পাখির সংঘর্ষে প্লেনের বাইরের স্তর ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা মাথায় রেখেই ককপিটের জানালা নকশা করা হয়।

সম্প্রতি লন্ডন থেকে উড্ডয়নের পর এক প্লেনের ককপিটের জানালায় ফাটল দেখা দিলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়, তবে প্লেনটি নিরাপদে অবতরণ করে। ভার্মন্ট বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই পারে, তবে স্যঁ-গোবার তৈরি জানালাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি।

পরামর্শক মাইক স্টেনজেলের ভাষ্যে, প্লেনের জানালা এমন এক পৃষ্ঠতল যা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশের সংযোগস্থলে অবস্থান করে বলেই এটি অত্যন্ত উন্নত ও নিখুঁত প্রযুক্তির পণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।