...|...|...

ধর্ম

প্রতিদিন যেসব দোয়া বেশি বেশি পড়বেন

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, সকাল ১০:২১ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:১১
Shares
প্রতিদিন যেসব দোয়া বেশি বেশি পড়বেন

মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর নেয়ামত। ঘুম থেকে ওঠা, ঘরের বাইরে বের হওয়া, পথে চলা, কোনো জায়গায় বসা কিংবা আবার উঠে দাঁড়ানো—সবই আল্লাহর দেওয়া সুযোগ।

একজন মুমিনের সৌন্দর্য হলো, জীবনের সাধারণ কাজগুলোতেও সে তার রবকে স্মরণ করে। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন অবস্থার জন্য এমন অনেক দোয়া শিখিয়েছেন, যেগুলো আমল করা সহজ, কিন্তু ফজিলত ও তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর।

তাই হাঁটতে-বসতে এবং দৈনন্দিন চলাফেরার সময় কিছু ছোট ছোট মাসনুন দোয়া ও জিকিরের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।

১. ঘর থেকে বের হওয়ার সময়

বাইরে যাওয়ার সময় আল্লাহর ওপর ভরসা করে পড়ুন,

بِسْمِ اللَّهِ، تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ

উচ্চারণ : বিসমিল্লাহি, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

অর্থ : আল্লাহর নামে বের হচ্ছি। আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।

হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এ দোয়া পড়ে, তাকে বলা হয়—তুমি হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছ, তোমার জন্য যথেষ্ট করা হয়েছে এবং তুমি সুরক্ষিত হয়েছ।

শয়তানও তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৯৫)
২. পথে চলার সময় আল্লাহর জিকির

হাঁটার সময় নির্দিষ্ট কোনো একটি দোয়া পড়তেই হবে—এমন নয়। তবে সুযোগমতো বেশি বেশি জিকির করা অত্যন্ত উত্তম। পড়তে পারেন,

سُبْحَانَ اللَّهِ

উচ্চারণ : সুবহানাল্লাহ।

অর্থ : আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত।

الْحَمْدُ لِلَّهِ

উচ্চারণ : আলহামদুলিল্লাহ।

অর্থ : সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

اللَّهُ أَكْبَرُ

উচ্চারণ : আল্লাহু আকবার।

অর্থ : আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।

لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ

উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।

অর্থ : আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)

তাই হাঁটার সময় অযথা কথাবার্তা বা অনর্থক চিন্তায় সময় নষ্ট না করে জিকিরে জিহ্বা সিক্ত রাখা যেতে পারে।

৩. কোনো বাহনে উঠলে

হাঁটার পাশাপাশি যাতায়াতের সময় অনেকেই গাড়ি, বাস, রিকশা বা অন্য কোনো বাহনে ওঠেন। তখন কোরআনে বর্ণিত এই দোয়া পড়া যায়,

سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ ۝ وَإِنَّا إِلَىٰ رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ

উচ্চারণ : সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাজা, ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনীন। ওয়া ইন্না ইলা রব্বিনা লামুনকালিবুন।

অর্থ : পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এটিকে আমাদের অধীন করে দিয়েছেন; অথচ আমরা নিজেরা এটিকে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আর নিশ্চয়ই আমরা আমাদের প্রতিপালকের কাছেই ফিরে যাব। (সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ১৩–১৪)

৪. মসজিদের দিকে হাঁটার সময়

মসজিদের দিকে যাওয়ার সময় অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফেরানো এবং নামাজের প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে যাওয়ার পথে দোয়া করার শিক্ষা দিয়েছেন।

اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا، وَفِي بَصَرِي نُورًا، وَفِي سَمْعِي نُورًا، وَعَنْ يَمِينِي نُورًا، وَعَنْ شِمَالِي نُورًا، وَفَوْقِي نُورًا، وَتَحْتِي نُورًا، وَأَمَامِي نُورًا، وَخَلْفِي نُورًا، وَاجْعَلْ لِي نُورًا

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাজআল ফি কালবি নুরান, ওয়া ফি বাসরি নুরান, ওয়া ফি সামই নুরান, ওয়া আন ইয়ামিনি নুরান, ওয়া আন শিমালি নুরান, ওয়া ফাওকি নুরান, ওয়া তাহতি নুরান, ওয়া আমামি নুরান, ওয়া খালফি নুরান, ওয়াজআল লি নুরান।

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমার অন্তরে নূর দিন, আমার দৃষ্টিতে নূর দিন, আমার শ্রবণে নূর দিন, আমার ডানে নূর দিন, আমার বামে নূর দিন, আমার ওপরে নূর দিন, আমার নিচে নূর দিন, আমার সামনে নূর দিন, আমার পেছনে নূর দিন এবং আমার জন্য নূর দান করুন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩১৬)

৫. কোনো জায়গায় বসলে

কোনো মজলিসে বসে অযথা বা গুনাহের কথাবার্তায় লিপ্ত না হয়ে আল্লাহর স্মরণ করা উচিত। মজলিস শেষে রাসুলুল্লাহ ﷺ যে দোয়াটি শিখিয়েছেন, সেটি নিয়মিত পড়ার অভ্যাস করা যায়।

سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ

উচ্চারণ : সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আসতাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইকা।

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনার পবিত্রতা ও প্রশংসা ঘোষণা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাই এবং আপনার কাছেই তওবা করি। এই দোয়াটি কাফফারাতুল মাজলিস নামে পরিচিত। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৩৩)

৬. বাজারে প্রবেশের সময়

প্রয়োজনে বাজারে প্রবেশের সময়ও একটি বিশেষ জিকির পড়া যায়।

لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، يُحْيِي وَيُمِيتُ، وَهُوَ حَيٌّ لَا يَمُوتُ، بِيَدِهِ الْخَيْرُ، وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ইউহই ওয়া ইউমিতু, ওয়া হুয়া হাইয়্যুল লা ইয়ামুতু, বিইয়াদিহিল খাইরু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির।

অর্থ : আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং সব প্রশংসা তাঁরই। তিনি জীবন দেন ও মৃত্যু দেন। তিনি চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। সব কল্যাণ তাঁর হাতে এবং তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৪২৮)

তবে এ হাদিসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে; তাই এটিকে সহিহ সূত্রে প্রমাণিত নিশ্চিত সুন্নত হিসেবে প্রচার না করে দুর্বল সূত্রে বর্ণিত আমল হিসেবে উল্লেখ করা অধিক সতর্কতার বিষয়।

৭. কোনো বিপদ বা ভয় দেখলে

পথে চলতে গিয়ে কোনো বিপদ, ভয় বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আল্লাহর ওপর ভরসা করা উচিত।

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ

উচ্চারণ : হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল।

অর্থ : আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক্ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৭৩)

৮. সবসময় পড়ার একটি শ্রেষ্ঠ দোয়া

হাঁটতে-বসতে, অবসর সময়ে কিংবা দিনের যেকোনো মুহূর্তে এই দোয়াটি পড়া যায়,

رَبِّ اغْفِرْ لِي

উচ্চারণ : রব্বিগফির লি।

অর্থ : হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন।

আর বেশি বেশি বলা যায়,

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণ : আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।

অর্থ : আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই তওবা করছি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও নিয়মিত ইস্তিগফার করতেন। তাই মুমিনের জিহ্বা যেন অবিরত আল্লাহর স্মরণে সিক্ত থাকে।

হাঁটা-বসা আমাদের প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজ। কিন্তু এই হাঁটাচলার সময় যখন আমরা আল্লাহকে স্বরণ করবো তখন সেটা আরো বরকতময় হয়ে উঠবে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৪১)

তাই আমাদের চলাফেরা যেন শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার মাধ্যম না হয়; বরং প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আল্লাহর স্মরণে সমৃদ্ধ হয়। হাঁটতে হাঁটতে জিকির, বসতে বসতে তাসবিহ, সুযোগ পেলেই ইস্তিগফার এবং প্রতিটি অবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা—এভাবেই একজন মুমিন তার সাধারণ দিনকে বরকতময় জীবনে পরিণত করতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের জিহ্বাকে তাঁর জিকিরে সিক্ত রাখুন, প্রতিটি পদক্ষেপকে নেক আমলে পরিণত করুন এবং আমাদের জীবনকে কোরআন-সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করুন। আমিন।