ক্ষুধার্ত একজন মানুষের সামনে যদি একদিকে রাখা হয় পূর্ণিমার চাঁদ আর অন্যদিকে এক টুকরো পোড়া রুটি সে কোনটি দেখবে?
সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার উত্তরটি আমরা জানি। ক্ষুধার্ত মানুষের চোখে পূর্ণিমার চাঁদও পোড়া রুটির মতো মনে হতে পারে। কারণ তখন সৌন্দর্যের চেয়ে ক্ষুধা বড় হয়ে ওঠে। কবিতার এই দৃশ্যই যেন নতুন করে ফিরে আসে The Scorched Roti: Twenty-One Essays on Being Human বইটির পাতায়।
তবে এখানে পোড়া রুটি শুধু ক্ষুধার প্রতীক নয়। এটি মানুষের বাস্তবতা বোঝার একটি জানালা।
আমরা কী জানি প্রশ্নটি হয়তো খুব সহজ। কিন্তু আমরা কার জীবন থেকে সেই জ্ঞান তৈরি করি প্রশ্নটি অনেক বেশি কঠিন।
Maksudul Shadat Akash-এর The Scorched Roti মূলত সেই কঠিন প্রশ্নের কাছেই পাঠককে নিয়ে যায়। মাত্র ৬৬ পৃষ্ঠার বইটিতে একুশটি প্রবন্ধ। বিষয়ও এক নয় মানসিক স্বাস্থ্য, হৃদ্রোগ, রাজনীতি, স্থাপত্য, মিডিয়া, গবেষণা প্রকাশনা, সমাজ ও মানুষের আচরণসহ নানা প্রসঙ্গ। কিন্তু সব আলোচনার কেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত একজনই - মানুষ।
একাডেমিয়ার বাইরে যে মানুষ
আমরা গবেষণার কথা শুনলে সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার কিংবা বৈজ্ঞানিক জার্নালের কথা ভাবি। সেখানে জটিল শব্দ থাকে, পরিসংখ্যান থাকে, reference থাকে। কিন্তু সেই গবেষণার বিষয় যে মানুষ অনেক সময় তাকে আর দেখা যায় না।
The Scorched Roti সেই মানুষটিকেই আবার সামনে আনার চেষ্টা করে।
বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক বৈষম্য কিংবা মানুষের আচরণ নিয়ে অসংখ্য গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু এসব গবেষণার বড় অংশ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। কখনো ভাষা কঠিন বলে, কখনো গবেষণাপত্রের মূল্য বেশি বলে, আবার কখনো লেখার ধরনই এমন যে গবেষক ছাড়া অন্য পাঠকের কাছে তা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে।
Akash-এর বইয়ের বিশেষত্ব হলো, তিনি গবেষণাকে মানুষের ভাষায় নিয়ে আসতে চান।
এখানে গবেষণা শুধু তথ্য নয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় মানুষের ভয়, অভিজ্ঞতা, শরীর, ক্ষুধা, বেদনা ও বেঁচে থাকার গল্প।
একুশটি প্রবন্ধ, একুশের স্মৃতি
বইটির নামেই আছে ‘Twenty-One Essays’। একুশটি প্রবন্ধের এই সংখ্যা বাংলাদেশের পাঠকের কাছে স্বাভাবিকভাবেই অন্যরকম অর্থ তৈরি করে।
একুশ আমাদের ভাষার কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু একটি ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ঘটনা ছিল না; এটি ছিল নিজের ভাষায় কথা বলার, নিজের পরিচয় প্রকাশের এবং নিজের অস্তিত্বের মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম।
তাই বইটি পড়তে গিয়ে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—মানুষ যে ভাষায় তার ক্ষুধা, ভয়, আনন্দ ও কষ্ট প্রকাশ করে, সেই ভাষায় কি তার জন্য তৈরি হওয়া বৈজ্ঞানিক জ্ঞানও পৌঁছানো উচিত নয়?
অবশ্যই উচিত।
এই জায়গায় The Scorched Roti শুধু গবেষণা নিয়ে বই থাকে না। এটি হয়ে ওঠে ভাষা ও জ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে একটি ভাবনার বই।
বিষয় আলাদা, মানুষ একই
বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর বিষয়বৈচিত্র্য। এক প্রবন্ধে মানসিক স্বাস্থ্য, অন্যটিতে রাজনৈতিক প্রতিরোধ, কোথাও স্থাপত্য, কোথাও শরীর, আবার কোথাও একাডেমিক প্রকাশনার জগৎ।
কিন্তু বিষয় পাল্টালেও বইটির মূল প্রশ্ন পাল্টায় না এই জ্ঞান মানুষের জীবনে কী অর্থ তৈরি করে?
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনায় PTSD, dissociation বা grief শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের শব্দ হয়ে থাকে না। এগুলোর পেছনে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতাও সামনে আসে।
আবার রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রসঙ্গে আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি শুধু একটি ছবি নয়। একটি শরীর কীভাবে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠতে পারে, বইটি সেই প্রশ্নও তোলে।
অর্থাৎ শরীর এখানে শুধু শরীর নয়। কখনো তা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কখনো সামাজিক বাস্তবতা, আবার কখনো রাজনৈতিক বক্তব্য।
যখন স্থাপত্যও কথা বলে
বইটির কিছু অংশে ধর্মীয় স্থাপত্য, সুফিবাদ ও মানবদেহের ধারণার মধ্যে সম্পর্ক খোঁজা হয়েছে। গম্বুজ, মিনার কিংবা পবিত্র স্থানের জ্যামিতিকে শুধু সুন্দর একটি স্থাপত্যরূপ হিসেবে না দেখে এর ভেতরে দেহ, লিঙ্গ ও আধ্যাত্মিকতার অর্থ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ধরনের আলোচনা পাঠককে পরিচিত বিষয়কে নতুন চোখে দেখতে শেখায়।
এটাই বইটির আন্তঃবিষয়ক শক্তি। একটি বিষয়কে তার নিজের ঘরের মধ্যে আটকে না রেখে অন্য বিষয়ের দরজায় নিয়ে যাওয়া।
জ্ঞানেরও কি বৈষম্য আছে?
বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা একাডেমিক প্রকাশনা।
কে গবেষণা প্রকাশ করতে পারেন? কার গবেষণা বেশি গুরুত্ব পায়? Global South-এর গবেষকদের জন্য আন্তর্জাতিক একাডেমিক জগতে পথটি কেন অনেক সময় কঠিন? Predatory journal কীভাবে গবেষকদের দুর্বলতাকে কাজে লাগায়?
প্রশ্নগুলো শুনতে একাডেমিক মনে হলেও এর সঙ্গে ক্ষমতা ও বৈষম্যের সম্পর্ক রয়েছে।
কারণ জ্ঞানও সব সময় নিরপেক্ষ জায়গা থেকে তৈরি হয় না। কে কথা বলছেন, কার কথা প্রকাশিত হচ্ছে, কার গবেষণা স্বীকৃতি পাচ্ছে এসবের মধ্যেও ক্ষমতার সম্পর্ক কাজ করে।
এই জায়গায় বইটি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন তোলে: জ্ঞানেরও কি শ্রেণিবৈষম্য আছে?
সহজ ভাষারও মূল্য আছে
Akash-এর লেখার সবচেয়ে বড় গুণগুলোর একটি হলো ভাষা। গবেষণার বিষয় নিয়ে লিখলেও ভাষা অতিরিক্ত ভারী নয়। ফলে পাঠককে প্রতিটি বাক্যে অভিধান নিয়ে বসতে হয় না।
একটি ভালো science communication-এর কাজ শুধু কঠিন বিষয়কে সহজ করা নয়। সহজ করতে গিয়ে যেন বিষয়টির গভীরতা নষ্ট না হয়, সেটিও জরুরি।
বইটি সেই ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছে।
তবে এর একটি সীমাও আছে। মাত্র ৬৬ পৃষ্ঠায় একুশটি বিষয় নিয়ে কথা বলায় কিছু আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই সংক্ষিপ্ত হয়েছে। কোথাও হয়তো আরও তথ্য, reference বা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দরকার হতে পারে।
কিন্তু এটিই আবার বইটির উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে। এটি কোনো textbook নয়। এটি পাঠককে সব উত্তর দিয়ে দেওয়ার বইও নয়। বরং এটি পাঠককে আরও প্রশ্ন করতে শেখায়।
পোড়া রুটির কাছে ফিরে আসা
বইটি শেষ করার পর আবার সেই পোড়া রুটির কথাই মনে পড়ে।
ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে পূর্ণিমার চাঁদও যখন পোড়া রুটির মতো হয়ে যায়, তখন আমরা বুঝতে পারি মানুষের বাস্তবতা না বুঝে তার জীবন নিয়ে কথা বলা কতটা অসম্পূর্ণ।
একটি গবেষণা হয়তো বলবে কী ঘটছে। কিন্তু বইটি জানতে চায় কার জীবনে ঘটছে?
একটি পরিসংখ্যান হয়তো একটি সমস্যার আকার দেখাবে। কিন্তু তার পেছনে থাকা মানুষটির গল্প কে বলবে?
এই জায়গাতেই The Scorched Roti আলাদা হয়ে ওঠে।
এটি শুধু একুশটি প্রবন্ধের সংকলন নয়। এটি গবেষণা ও মানুষের জীবনের মাঝখানে তৈরি হয়ে যাওয়া দূরত্বের দিকে তাকানোর একটি চেষ্টা।
এই বইটির চমৎকার একটা দিক হলো বইটি বার বার এটিই বোঝায় - জ্ঞান শুধু জানার জন্য নয়। জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্যও।
আর মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে কখনো কখনো আকাশের পূর্ণিমার দিকে তাকানোর আগে মাটিতে পড়ে থাকা পোড়া রুটিটুকু দেখতে হয়।
কারণ মানুষকে না দেখে মানুষের জন্য তৈরি জ্ঞান কখনোই পুরোপুরি পূর্ণ হয় না।

