পোষা বিড়ালের মলের মাধ্যমে এমন একটি পরজীবীর উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা, যা মানুষের শরীরেও সংক্রমণ ঘটাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দেড় লাখের বেশি পোষা বিড়ালের মলের নমুনা পরীক্ষা করে এ পরজীবীর সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, গ্রীষ্মের তুলনায় শীতকালে বিড়ালের মধ্যে পরজীবীটির উপস্থিতি বেশি থাকে।
বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সায়েন্সঅ্যালার্টের ১৭ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে গবেষণার এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী পিএলওএস ওয়ান-এ।
গবেষণার বিষয় ছিল জিয়ার্ডিয়া ডুওডেনালিস নামের এক ধরনের প্রোটোজোয়া পরজীবী। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পোষা বিড়ালের মলের ১ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি নমুনা বিশ্লেষণ করে এর উপস্থিতি ও সংক্রমণের ধরন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন গবেষকেরা। তাদের দাবি, উত্তর আমেরিকার পোষা বিড়ালের মধ্যে পরজীবীটির উপস্থিতি নিয়ে এটি এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় গবেষণা।
পরীক্ষায় ৯ হাজার ৯৬২টি নমুনায় পরজীবীটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মোট নমুনার হিসাবে এ হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি ১৬টি নমুনার প্রায় একটিতে পরজীবীটি শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকেরা আরও দেখতে পান, আক্রান্ত নমুনার মধ্যে ১ হাজার ৮৪০টিতে পরজীবীটির এমন জিনগত ধরন রয়েছে, যা মানুষকেও সংক্রমিত করতে পারে। আক্রান্ত নমুনার ১৮ দশমিক ৫ শতাংশে এ ধরনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সব নমুনা বিবেচনায় মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম এমন জিনগত ধরনের উপস্থিতির হার প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ।
জিয়ার্ডিয়া ডুওডেনালিস সংক্রমিত হলে সব সময় উপসর্গ দেখা দেয় না। তবে সংক্রমণের কারণে মানুষ ও প্রাণীর জিয়ার্ডিয়াসিস হতে পারে। এ রোগে ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও দুর্বলতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত প্রাণীর স্বাভাবিক বৃদ্ধিও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বয়স ও লিঙ্গভেদে সংক্রমণের পার্থক্য
গবেষণায় বিড়ালের বয়সের সাথে পরজীবী শনাক্তের হারের পার্থক্য দেখা গেছে। বিড়ালছানার মলের নমুনায় পরজীবীটির উপস্থিতি ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে, ১০ বছর বা তার বেশি বয়সী বিড়ালের নমুনায় এ হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
এ ছাড়া, স্ত্রী বিড়ালের তুলনায় পুরুষ বিড়ালের মধ্যে পরজীবী শনাক্তের হার কিছুটা বেশি পাওয়া গেছে। বন্ধ্যাকরণ করা হয়নি-এমন প্রাপ্তবয়স্ক বিড়ালের মধ্যে পরজীবীটির উপস্থিতি সাধারণত বন্ধ্যাকরণ করা বিড়ালের তুলনায় বেশি ছিল। তবে বিড়ালছানার ক্ষেত্রে এ প্রবণতা ছিল উল্টো।
শীতকালে সংক্রমণের হার বেশি
গবেষণায় অঞ্চলভেদেও পরজীবী শনাক্তের হারে পার্থক্য পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে বিড়ালের মধ্যে পরজীবী শনাক্তের হার ছিল সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আক্রান্ত বিড়ালের নমুনায় মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম জিনগত ধরনের হার ছিল সবচেয়ে বেশি, ২১ দশমিক ৬ শতাংশ।
ঋতুভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রীষ্মকালে পরজীবী শনাক্তের হার ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। শীতকালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ১ শতাংশে।
গবেষকদের ধারণা, ঠান্ডা ও আর্দ্র পরিবেশে পরজীবীটির সিস্ট বা প্রতিরোধী আবরণযুক্ত অবস্থা দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। বিপরীতে, গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় সেগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনা কমতে পারে। পরিবেশগত এসব পার্থক্য ঋতুভেদে সংক্রমণের হারের তারতম্যের একটি সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করছেন তাঁরা।
পোষা বিড়ালের যত্নে সতর্কতা জরুরি
মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণীকে সংক্রমিত করার সক্ষমতার কারণে জিয়ার্ডিয়া ডুওডেনালিস জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তাদের মতে, বিশেষ করে যেসব বিড়ালের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি, সেগুলোর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। যেসব পরিবারে ছোট শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন মানুষ রয়েছেন, সেসব ক্ষেত্রে পোষা বিড়ালের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার দিকে বাড়তি নজর দেওয়া উচিত।
বিড়ালের মল পরিষ্কারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, মল দ্রুত সরিয়ে ফেলা এবং পোষা প্রাণীর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। প্রয়োজন হলে পশুচিকিৎসকের পরামর্শে মলের নমুনা পরীক্ষা করানো যেতে পারে।
তবে গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পোষা বিড়ালের ওপর পরিচালিত হয়েছে। তাই এর ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশের পোষা বিড়ালের মধ্যে পরজীবীটির সংক্রমণের হার নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বুঝতে স্থানীয় পর্যায়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।


