...|...|...

ক্যাম্পাস

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের স্মৃতিবিজড়িত রাস্তার এ কী হাল

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১২:৩৫
Shares
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের স্মৃতিবিজড়িত রাস্তার এ কী হাল

ছবি: টাইমস টুডে

একসময় যে সড়ক ছিল শিক্ষার্থীদের পদচারণা, আড্ডা আর নানা আয়োজনের প্রাণকেন্দ্র, সেই সড়কের চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই বদলে গেছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গেট থেকে বিজয় ভাস্কর্য পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কোথাও মাটি তুলে রাখা হয়েছে, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নির্মাণসামগ্রী। কিছু অংশে সীমিত করা হয়েছে মানুষের চলাচল। এতে স্বাভাবিক চলাচলে ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী ও পথচারীরা।

তবে এই সড়কটি শুধু যাতায়াতের পথ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছে এটি নানা স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পরিচিত স্থান। একসময় সড়কের দুই পাশে থাকা জারুল, সোনালু, কৃষ্ণচূড়াসহ বিভিন্ন গাছ বসন্তে রঙিন ফুলে সেজে উঠত। ক্লাস শেষে গাছের ছায়ায় বসে আড্ডা, গল্প কিংবা নিরিবিলি বিকেলে একা হাঁটা, সবকিছুরই সাক্ষী ছিল এই পথ।

নতুন শিক্ষাবর্ষে নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে এই সড়কে আঁকা হতো নানা রঙের আলপনা। কুয়াশা উৎসবসহ বিভিন্ন আয়োজনে গাছগুলো সাজানো হতো রং ও আলোকসজ্জায়। কখনো বৃষ্টিতে ভিজে ‘বৃষ্টি বিলাস’, কখনো প্রিয়জনের সঙ্গে হাঁটা, আবার কখনো বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এমন অসংখ্য মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সড়কটি।

কিন্তু সেই পরিচিত পরিবেশ এখন আর আগের মতো নেই। সড়কের বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজ চলায় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত চলাচলেও তৈরি হয়েছে সাময়িক অসুবিধা। পাশাপাশি সড়কের দুই পাশের বিভিন্ন গাছ কেটে ফেলা বা প্রতিস্থাপন করার সিদ্ধান্তে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও ক্ষোভ।

সম্প্রতি গাছ রক্ষার দাবিতে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আন্দোলনও করেছেন। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। তবে উন্নয়নের নামে যেন ক্যাম্পাসের পরিবেশ, সৌন্দর্য ও দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো হারিয়ে না যায়। প্রয়োজনীয় গাছ সংরক্ষণ করে বিকল্প নকশায় উন্নয়নকাজ করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সড়কটির বর্তমান পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে চলমান উন্নয়নকাজ। ফাস্টগেট থেকে বিজয় ভাস্কর্য পর্যন্ত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে সড়কের বিভিন্ন স্থানে খনন, মাটি অপসারণ ও অন্যান্য নির্মাণকাজ করা হচ্ছে। উন্নয়নকাজ শেষ হলে সড়কটি আরও প্রশস্ত ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার অংশ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা বলেন, “ক্লাস শেষে ক্লান্ত বিকেলে গাছের ছায়ায় হেঁটে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, নিরিবিলি বিকেলে একা পথচলা, বৃষ্টিতে ভেজা মুহূর্ত, ফুলের সৌরভ আর নতুন শিক্ষার্থীদের প্রথম ক্যাম্পাস পরিচয়, অসংখ্য গল্পের নীরব সাক্ষী এই পথ। উন্নয়ন হোক, কিন্তু সেই উন্নয়নের ছোঁয়ায় যেন ক্যাম্পাসের সবুজ সৌন্দর্য ও স্মৃতির এই ঠিকানাটি হারিয়ে না যায়।”

আর্থ ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুল হাসান বলেন, ফার্স্ট গেট থেকে ‘চির উন্নত মম শির’ পর্যন্ত রাস্তাটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সুন্দর ও স্মৃতিবিজড়িত স্থান। সোনালু, জারুল ও কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের অসংখ্য স্মৃতি ও আবেগ জড়িয়ে আছে। উন্নয়নের নামে ১৫-১৬ বছরের পুরোনো এসব গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের সেই আবেগে আঘাত করবে। তাই উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অনুভূতিকে বিবেচনায় নিয়ে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানাই।

ন্যাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও গ্রীন ক্যাম্পাসের উপদেষ্টা রাতুল মুন্সি বলেন, “ক্যাম্পাসে গেলে এই রাস্তায় হাঁটতে পারি না, কষ্ট হয়। পরিকল্পনার অভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে বারবার গাছ ধ্বংস করা হচ্ছে। নতুন লাগানো ফিস্টেল পামগুলো ছায়া বা ফল দেবে না, বসন্তে জারুল-সোনালুর সেই সৌন্দর্যও থাকবে না। সমাবর্তনে সাবেক শিক্ষার্থীরা স্মৃতিবিজড়িত গাছের সঙ্গে ছবি তোলেন, কিন্তু আমাদের সেই স্মৃতিগুলোই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন হোক, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ-প্রকৃতি ও স্মৃতি ধ্বংস করে নয়।”

পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরে পরিচালক প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “রাস্তা সম্প্রসারণের জন্যই নতুন করে নির্মাণকাজ চলছে। উন্নয়নের অংশ হিসেবে ১৫ ফুটের রাস্তাটি ৪৫ ফুটে সম্প্রসারণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে বিকল্প কোনো নকশায় কাজ করার সুযোগ নেই। উন্নয়নের প্রয়োজনে গাছ কাটতে হলে তা করা হবে। তবে প্রয়োজনে গাছগুলো অন্যত্র প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে, পাশাপাশি নতুন করে গাছও লাগানো হবে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় যে জায়গাগুলো পেয়েছে, সেগুলো মূলত ভবন ও রাস্তা নির্মাণসহ উন্নয়নকাজের জন্যই।”