...|...|...

ক্যাম্পাস

নকশিকাঁথার সুঁই-সুতায় হজের স্বপ্ন বুনছেন চাঁন মিয়া

প্রীতম কান্তি গোপ, কুবি
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১০:০৩
Shares
নকশিকাঁথার সুঁই-সুতায় হজের স্বপ্ন বুনছেন চাঁন মিয়া

কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগর পাড়ে বসে সেলাই করছেন চাঁন মিয়া। ছবি: টাইমস টুডে

ব্যস্ত নগরী কুমিল্লা। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই শহরে নিজেদের হাজারো স্বপ্নের গল্প বোনেন। কত সংগ্রাম, কত লড়াই-উদ্দেশ্য একটাই; স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। মানুষের স্বপ্ন কি শুধু নিজেকে সফল হিসেবে দেখা? নাকি এর বাইরেও থাকে কোনো গভীর আকাঙ্ক্ষা?

কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগর পাড়ে বসে থাকা চাঁন মিয়ার গল্প যেন সেই ভিন্ন ধরনের স্বপ্নের কথাই বলে।

হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার সাতাখ গ্রামে চাঁন মিয়ার বাড়ি। স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে ছিল তার সংসার। ছোট মেয়েটি ছিল জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই ছোট মেয়েকে হারান চাঁন মিয়া। বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন পাশের গ্রামেই।

সত্তরের কোঠায় পৌঁছে যাওয়া চাঁন মিয়া ছোটবেলা থেকেই ছিলেন কর্মঠ। জীবিকার তাগিদে জীবনের বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের কাজ করেছেন তিনি। সবশেষ কাজের সন্ধানে হবিগঞ্জের লাখাই থেকে চলে আসেন কুমিল্লায়।

মানুষের কাজ করার উদ্দেশ্য কী থাকে? অর্থ উপার্জন, পরিবারের চাহিদা পূরণ কিংবা একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকা। কিন্তু চাঁন মিয়া যেন এখানেই সবার চেয়ে আলাদা। তার এই পরিশ্রমের পেছনে রয়েছে একটিই লক্ষ্য-পবিত্র হজ পালন।

চাঁন মিয়া বলেন, দিন দিন মনে হয় আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। উপরওয়ালার কাছে একটাই নিবেদন, মৃত্যুর আগে যেন আল্লাহ তায়ালা আমাকে একবার হজ করার সুযোগ করে দেন।

এই স্বপ্ন পূরণের জন্যই প্রতিদিন নকশিকাঁথা সেলাই করেন তিনি। ধর্মসাগর পাড়, টমছম সেতু কিংবা শহরের বিভিন্ন জায়গায় বসে কাঁথা সেলাই করেন আর থাকেন বিক্রির অপেক্ষায়।

নকশিকাঁথা সেলাই করে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা আয় করেন চাঁন মিয়া। সেই অর্থ থেকেই হজের জন্য সঞ্চয় করছেন তিনি। ইতোমধ্যে পাসপোর্টও তৈরি করেছেন। তার সঞ্চয়ের পরিমাণ এখন প্রায় ৩০ হাজার টাকা।

চাঁন মিয়া বলেন, কোনোদিন দুই-তিনটা কাঁথা বিক্রি হয়, আবার কোনো দিন একটাও হয় না। তারপরও আমি প্রতিদিন ভাবি, হয়তো একদিন হজে যাওয়ার মতো টাকা জোগাড় করতে পারব।

তবে শুধু কাঁথা সেলাই করেই নয়, পুরোনো প্লাস্টিক কিংবা নষ্ট মোবাইল ফোন সংগ্রহ করে বিক্রি করেও হজের জন্য টাকা জমাচ্ছেন তিনি। সামান্য আয়ের প্রতিটি টাকাই তার কাছে এখন স্বপ্নপূরণের পাথেয়।

ধর্মসাগরের পাড়ে বসে কথা বলতে বলতে তিনি বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলেন। তার চোখে ছিল অপেক্ষা, কণ্ঠে ছিল বিশ্বাস। যেন তিনি নিশ্চিত, একদিন শেষ হবে এই অপেক্ষার প্রহর।

চাঁন মিয়ার গল্প মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সব স্বপ্ন অর্থ, সম্পদ কিংবা প্রতিষ্ঠাকে ঘিরে নয়। কিছু স্বপ্ন থাকে আত্মার গভীরে, বিশ্বাসের ভেতরে। সেসব স্বপ্নের পেছনে ছুটতে মানুষ বয়স, কষ্ট কিংবা দারিদ্র্য-কোনো কিছুকেই বাধা মনে করে না।

ধর্মসাগরের পাড়ে বসে থাকা এই বৃদ্ধ মানুষটি তাই শুধু নকশিকাঁথা সেলাই করেন না। সুঁই-সুতার প্রতিটি ফোঁড়ে তিনি ধীরে ধীরে বুনে চলেছেন নিজের মক্কা যাওয়ার পথ; এক জীবনের প্রার্থনা, এক অদম্য বিশ্বাসের গল্প।