...|...|...

অপরাধ

তিন মাসে গড়ে ৩ শতাধিক খুন, নিয়ন্ত্রণে বাধা কোথায়

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, সকাল ৯:৫৮ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৮:২৮
Shares
তিন মাসে গড়ে ৩ শতাধিক খুন, নিয়ন্ত্রণে বাধা কোথায়

ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি রংপুরে এক শিক্ষক পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনা দেশের সাধারণ মানুষের মনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। তবে এই শঙ্কা কেবল একটিমাত্র হত্যাকাণ্ডের ফল নয়; বরং গত কয়েক মাস ধরে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই এমন নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। 

পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মে থেকে জুলাই-এই তিন মাসেই সারা দেশে ৯৩৪টি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। অর্থাৎ, এই তিন মাসে গড়ে প্রতি মাসে তিন শতাধিক এবং প্রতিদিন গড়ে ১০ জনের বেশি মানুষ খুন হয়েছেন।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে সারাদেশে মোট ২ হাজার ৭৬টি খুনের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৬ এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি খুন হয়েছে। পুলিশ বলছে, চুরি ও ডাকাতির মতো অপরাধ কিছুটা কমলেও খুনের ঘটনাগুলো কার্যকরভাবে কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০-র মতো খুনের ঘটনা ঘটছে। গড়ে প্রতিদিন ১০টা করে খুন যেন আমাদের ভাগ্যে লেখা রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম সাত মাসে শুধু মব সহিংসতায় ১৩৪ জন এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ৭৭ জন নিহত হয়েছেন।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার আধিপত্য, রাজনৈতিক কোন্দল, মাদক এবং পারিবারিক বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো সবচেয়ে বেশি ঘটছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বৈধ-অবৈধ অস্ত্রের অবাধ বিস্তার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, এখন অনেকের হাতে হাতে অস্ত্র চলে গেছে। অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান বাড়ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিবাদ কিংবা ক্ষমতার আধিপত্যের কারণে খুন ও সহিংসতা বাড়ছে। যেভাবে খুন-সহিংসতার মতো অপরাধ বাড়ছে, তা দমনে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এজন্য সরকারের বিশেষায়িত অভিযান পরিচালনা করা দরকার।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সংঘাতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি।

আসকের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ৪০০টি রাজনৈতিক সংঘাতে ২৯৭৪ জন আহত এবং ৭৭ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে ৪ জন, জামায়াত-বিএনপির সংঘর্ষে ৯ জন এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ও মানবাধিকারকর্মী এলিনা খান বলেন, আমরা দেখছি নির্বাচিত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার পরিমাণ বাড়ছে। পদ-পদবির জন্য মারামারি হচ্ছে। এই দায় তো সরকারকেই নিতে হবে। মানুষ নিরাপত্তা চায়, যেকোনো মূল্যে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও খুনোখুনি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ হচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নে অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, রাজনৈতিক সংঘাত তো আগে থেকেই চলে আসছে এবং চাইলেই রাতারাতি তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে আশার কথা হলো, বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশের ওপর কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ নেই এবং পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে। বিগত সময়ের তুলনায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ও কার্যকারিতা পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এই সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। তাই কেবল গতানুগতিক পুলিশিং দিয়ে এই ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা দূর করা।