...|...|...

সারাদেশ

তিন জবানবন্দিতে উঠে এলো অপ্রতীম হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা

কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:০৬ | আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:০৮
Shares
তিন জবানবন্দিতে উঠে এলো অপ্রতীম হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা

১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমকে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। অপ্রতীমের আইফোনের প্রতি লোভ থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে আদালতে দেওয়া তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরে ছবি তোলার কথা বলে অপ্রতীমকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমে তার কাছ থেকে আইফোনটি নেওয়া হয়। ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তাকে হত্যা করা হয়।

কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম হত্যা মামলায় গ্রেফতার তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

তিন জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতীমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন নেওয়া এবং হামলার মূল ঘটনাক্রমে বেশ কিছু মিল রয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সময় কে কোথায় ছিলেন এবং ঘটনার পর কে কী করেছেন, সে বিষয়ে বর্ণনায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

 অপ্রতীম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেফতার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। 

আগেই করা হয়েছিল হত্যার পরিকল্পনা

তিন আসামির জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনার বিষয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতীমের সাথে তার পরিচয় ছিল। তার এক বন্ধুর মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির জন্য অপ্রতীম তাদের সাথে বিভিন্ন জায়গায় যেত।

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, অপ্রতীমের আইফোনের প্রতি তার এবং অপ্রতীমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে তাদের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতীমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তুহিন।

অপ্রতীমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের বৈঠকের কথা এসেছে। তবে সে হত্যার পরিকল্পনার মূল দায় তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার ভাষ্য, তুহিন আইফোন নেওয়ার জন্য অপ্রতীমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

তৃতীয় কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার এক বন্ধু তাকে জানায়, তুহিনের সাথে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতীমকে হত্যা করা হবে।

তিন জবানবন্দির বর্ণনা অনুযায়ী, হত্যার সিদ্ধান্ত ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়নি। 

টিকটক থেকে যোগাযোগ, ছবি তোলার কথা বলে দেখা

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতীমের সাথে তার দেখা হয়। সেখান থেকে অপ্রতীম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই তুহিন টিকটকে অপ্রতীমকে মেসেজ করেন। পরে অপ্রতীম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে ওই নম্বরে তাদের কথা হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতীম তার বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ছবি তোলা। ছবি তোলার এই পরিচিত সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত অপ্রতীমকে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে বলে তিন আসামির জবানবন্দি থেকে ধারণা পাওয়া যায়।

আলাদা পথ ধরে পাহাড়ে যায় চারজন

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতীমের সাথে দেখা হওয়ার কথা জানিয়েছেন তুহিন। এরপর তিনি অপ্রতীমকে কৌশলে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান। জায়গাটি নির্জন এবং সেটি তার চাচা শাহ আলমের পাহাড় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তুহিন।

অন্যদিকে অপ্রতীমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, দুপুর দুইটার পর কোটবাড়ি বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতীমের সাথে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে তার আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়।

যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যও প্রায় একই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে ওই কিশোরের সাথে তার দেখা হয়। সেখানেই তাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এরপর বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ে যায়। পাহাড়ে গিয়ে তারা অপ্রতীম ও তুহিনকে একসাথে বসে থাকতে দেখে। পরে চারজন কিছু সময় গল্প ও আড্ডা দেয়। এ বিষয়েও তিন জবানবন্দিতে কাছাকাছি বর্ণনা পাওয়া গেছে।

প্রথমে নেওয়া হয় অপ্রতীমের আইফোন

হত্যাকাণ্ডের আগে অপ্রতীমের আইফোন কীভাবে নেওয়া হয়, সে বিষয়েও তিন আসামির বক্তব্যে মিল রয়েছে। অপ্রতীমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, সে অপ্রতীমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতীম সেটি তাকে দেয়। কিছু সময় ফোনটি ব্যবহারের পর সে সেটি তুহিনের হাতে দেয়। তুহিনের জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য এসেছে।

ওই কিশোর অপ্রতীমের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে কিছুক্ষণ ব্যবহার করার পর ফোনটি আর অপ্রতীমকে ফেরত না দিয়ে তুহিনের হাতে দেয়। এরপর আইফোন ফেরত চাওয়া নিয়ে অপ্রতীম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পুলিশের আগের বক্তব্যেও বলা হয়েছিল, অপ্রতীম আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেন। এরপরই মারধরের ঘটনা ঘটে।

প্রথম আঘাত করেন তুহিন

তিন আসামির জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ মিলগুলোর একটি হলো—অপ্রতীমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তিনি অপ্রতীমকে থাপ্পড় দেন। এরপর পাশে পড়ে থাকা একটি কোদালের হাতল নিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। পরে অন্য দুজনকে অপ্রতীমকে মারতে বলেন।

অপ্রতীমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর বলেছে, তুহিনের সাথে অপ্রতীমের ঝগড়া হওয়ার পর তুহিন কোদালের হাতল দিয়ে প্রথমে অপ্রতীমের মাথায় আঘাত করেন। তৃতীয় কিশোরের জবানবন্দিতেও বলা হয়েছে, তুহিনই প্রথম কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতীমকে আঘাত করেন।

আইফোন বিক্রি করে টাকা ভাগ করার পরিকল্পনা

শুধু ফোন নেওয়া নয়, সেটি বিক্রি করে টাকা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। তুহিন জানিয়েছেন, অপ্রতীমের আইফোনের প্রতি তাদের লোভ হয়েছিল। অপ্রতীমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের জবানবন্দিতে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আইফোনটি বিক্রি করে পাওয়া টাকা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। 

তৃতীয় কিশোরও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে বলা হয়েছিল, আইফোনটি বিক্রি করে পাওয়া টাকা থেকে তাকে ভাগ দেওয়া হবে। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, হত্যার পেছনে আইফোন নেওয়া এবং সেটি বিক্রি করে অর্থ ভাগ করে নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল—এমন তথ্য তিন জবানবন্দিতেই উঠে এসেছে।

হত্যার পর কে কোথায় গেল

অপ্রতীমের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে কে কীভাবে চলে যায়, সে বিষয়ে তিন আসামির বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তুহিনের ভাষ্য, অপ্রতীম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন।

দ্বিতীয় জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, অপ্রতীম মারা যাওয়ার পর দুই কিশোর একসাথে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। তখন তুহিন ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তৃতীয় কিশোর জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসাথে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে চলে যান। তবে অপ্রতীমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল—তিন আসামির বর্ণনাতেই এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

তুহিনের জবানবন্দিতে তার বন্ধুকে নিয়ে নতুন তথ্য

তুহিনের জবানবন্দিতে তার এক বন্ধু সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। তুহিন জানিয়েছেন, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি তার এক বন্ধুকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তার কাছে পুরো ঘটনা খুলে বলেন। এমনকি হত্যার পরিকল্পনার বিষয়েও তার বন্ধু আগে থেকেই জানতেন বলে তুহিনের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সাথে তুহিনের বন্ধুর সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়নি।

পুলিশ পরে তুহিনের বন্ধুকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য ছিল, তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি; তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন। পুলিশ সূত্র আরও জানিয়েছিল, হত্যার দিন রাতেই তুহিন তার বন্ধুর সাথে দেখা করে তাকে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত জানান। 

পরদিন অপ্রতীমকে খুঁজতে যায় তারা

হত্যার পরদিন আসামিদের আচরণ নিয়েও জবানবন্দিতে বিভিন্ন তথ্য এসেছে। তুহিন জানিয়েছেন, পরদিন সকালে অপ্রতীমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতীমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি তার বন্ধুকে নিয়ে কোটবাড়ি এলাকায় অপ্রতীমকে খুঁজতে যান।

অপ্রতীমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতীমের বাবার একজন সহকারীর সাথে অপ্রতীমকে খুঁজতে বের হয়। পরে লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেও ঘটনাস্থলে যায়।

তৃতীয় কিশোরের বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতীমের লাশ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতীমের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে স্ট্যাটাস দেয়। এর মধ্যেই পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

 তদন্তে এখনো যেসব প্রশ্ন

তিন আসামির জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা ও মূল ঘটনাপ্রবাহের বেশ কিছু বিষয়ে মিল থাকলেও কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তের বিষয় হয়ে রয়েছে। হত্যার পরিকল্পনায় কার ভূমিকা কতটা ছিল, ঘটনাস্থলে প্রত্যেকে কী ধরনের ভূমিকা পালন করেছে, আইফোনটি হত্যার পর কোথায় নেওয়া হয়েছিল এবং হত্যার সাথে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে যাচাই করা হচ্ছে।

বিশেষ করে তুহিনের জবানবন্দিতে তার বন্ধুর নাম আসার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, অন্য দুই আসামির বক্তব্যে তুহিনের বন্ধুর সম্পৃক্ততার কথা নেই। ২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর পুলিশ জানিয়েছিল, তাদের বক্তব্য অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সাথে যাচাই করা হবে। হত্যাকাণ্ডে আর কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।