...|...|...

জাতীয়

তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে ছয় প্রশ্ন, মিলছে না উত্তর

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ২:৫৫
Shares
তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে ছয় প্রশ্ন, মিলছে না উত্তর

ছবি: সংগৃহীত

সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। নিখোঁজ হওয়ার পর রাজধানীর উপকণ্ঠে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তার লাশ। পরিবারের দাবি, যে এলাকা থেকে তার লাশে উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে আগে কখনো যাননি তাহসিফ। নিখোঁজ হওয়ার আগে বাসা থেকে বেরিয়ে কার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে ‘আসছি’ লিখে মেসেজ পাঠানোর পর তার সাথে কী ঘটেছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। এ ছাড়া নিজের চাকরি থেকে অব্যাহতি এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়েও মৃত্যুর আগে কথা বলেছিলেন তিনি। সবকিছু প্রকাশ করতে না পারার কথাও জানিয়েছিলেন তাহসিফ। তার মৃত্যুর পর সেই বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে সামনে এসেছে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মৃত্যুর আগে কোন বিষয়গুলো তিনি প্রকাশ করতে পারেননি? পরিবারের অজানা কোনো স্থানে কীভাবে পৌঁছালেন তিনি? বাসা থেকে ডেকে নেওয়া সেই ছোট ভাই কে? নিখোঁজ হওয়ার পর সন্ধ্যা থেকে রাত ১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত তার সাথে কী ঘটেছিল? কে বা কারা তাকে ‘আসছি’ বলে মেসেজ পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করেছিল? আর কোন বিষয় নিয়ে আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন তিনি? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে এখন তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে পরিবার ও সংশ্লিষ্টরা।

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল গনমাধ্যমকে জানান, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামে তার ছেলের এক বন্ধু ও জুনিয়র বাসার নিচ থেকে তাকে ডাকেন। মাকে জানিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান তাহসিফ। এরপর পরিবারের সদস্যরা বারবার চেষ্টা করেও তার সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে মেসেজ দিয়ে তিনি জানান, ‘আম্মু, আমি আসছি।’ এরপর আর তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গনমাধ্যমকে হেলাল বলেন, ঘটনার দিন তাহসিফ প্রায় পুরো সময় তার মায়ের সাথে ছিলেন। পরিবারের জন্য কেনাকাটাও করেছিলেন। সন্ধ্যার পর দ্বীপ নামে এক বন্ধু ও জুনিয়র ডাকলে মাকে বলে নিচে নেমে যান। এরপর আর বাসায় ফেরেননি।

হেলাল বলেন, ‘সে অত্যন্ত জেন্টেল প্রকৃতির, অত্যন্ত সোশ্যাল। সিনিয়র-জুনিয়র সবার সাথে তার ভালো সম্পর্ক। যেদিনের ঘটনা, সে সারাদিন তার মায়ের সাথে ছিল, শপিং করেছে, আমার জন্যও কিছু শপিং করেছে। সন্ধ্যার পরে দ্বীপ নামে ওর একটা বন্ধু ছোটভাই ওকে নিচ থেকে ডাকে। সে তার মাকে বলে, মা দ্বীপ আসছে, একটু কথা বলে আসি। এসব বলে নিচে যায়, আর ফেরেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এর মধ্যে ওর মা অনেকবার চেষ্টা করেছে, ও ফেরেনি। এবং রাত ১টা ৩৫ মিনিটে সে মেসেজ দিয়েছে, সে আসছে। আম্মু আমি আসছি, এই রকম একটা মেসেজ দিয়েছে। এরপর থেকে তাকে আর লোকেট করতে পারিনি।’

ছেলেকে খুঁজতে বুধবার দুপুরে তুরাগ থানায় গিয়েছিলেন বলে জানান হেলাল। তার ভাষ্য, তখন পুলিশ তাকে আশ্বস্ত করেছিল। তবে ওই দিন বিকেলেই উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফোন করে তার ছেলের  উদ্ধারের খবর জানান।

হেলাল বলেন, ‘আমি তুরাগ থানায় গিয়েছিলাম বুধবার দুপুরের দিকে। তারা (তুরাগ থানা) বললেন, এমন কোনো ব্যাড নিউজ নাই, আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন। সন্ধ্যার আগে, সোয়া ৫টার দিকে উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমার সাথে কথা বললেন। আমার নাম, ছেলের নাম নিশ্চিত হয়ে তারপর আমাকে জানালেন যে, নদীতে ডেডবডি পাওয়া গেছে।’

লাশ উদ্ধারের স্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটা হলো রাজাবাড়ির ঘাটে। আটিপাড়া দিয়ে যেতে হয়। ওই এলাকায় আমার ছেলে কখনো যায়নি। এখন কারা বা কে তাকে হত্যা করেছে, এটা আমি জানি না।’

তাহসিফের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করা হলেও ময়নাতদন্ত ও তদন্তের ফলাফল ছাড়া মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। নিখোঁজ হওয়ার সময়কাল, পরিবারের সাথে তার শেষ যোগাযোগ এবং মরদেহ উদ্ধারের স্থান নিয়ে বাবার বক্তব্য তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বিমানবাহিনী থেকে তাহসিফের অব্যাহতি এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়েও পরিবারকে বিস্তারিত জানানো হয়নি বলে দাবি করেছেন তার বাবা।

হেলাল বলেন, ‘৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের ভিডিও শেয়ার করার কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল কি না, এটা সে আদৌ করেছে কি না, সে বিষয়ে আমাদের জানায়নি। এটা তার ডিপার্টমেন্ট বলতে পারবে। ওর ডিপার্টমেন্ট আমাদের সিম্পলি জানিয়েছে, এটা ডিসিপ্লিন অর্গানাইজেশন, ওর ইনডিসিপ্লিনারি কাজের কারণে ওকে ইস্তফা দেওয়া হয়েছে।’

তাহসিফ কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে হেলাল বলেন, ‘সে হুমকি-ধামকির বিষয়ে আমাদের কিছু বলেনি। সে বলেছিল যে, সে একটু আশঙ্কা করছে। হুমকি বা থ্রেটের বিষয়ে সে কিছুই বলেনি।’

তার বাবার তথ্য অনুযায়ী, বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর তাহসিফ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, নেত্র নিউজ হয়ে সর্বশেষ ভার্গো টোব্যাকোতে কর্মরত ছিলেন তিনি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও তাহসিফ ধারণ বা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এমন আলোচনা আগেও ছিল। তবে এ বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। মৃত্যুর প্রায় তিন মাস আট দিন আগে প্রকাশিত একটি পডকাস্টে তাহসিফ নিজেই অভিযোগটিকে ‘প্রমাণহীন অভিযোগ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।

গত ২১ জুলাই ‘স্পিক উইথ রশিদ’ নামের একটি চ্যানেলে প্রকাশিত ওই পডকাস্টে নিজের চাকরি ও বিমানবাহিনীর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন তিনি। তাকে নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনকেও প্রোপাগান্ডা বলে দাবি করেছিলেন তাহসিফ।

সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে উপস্থাপক শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে তাহসিফ বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে ভিডিওটি তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হলেও, ভিডিওটি তিনিই ধারণ করেছেন-এমন দাবি করা হয়নি। এ অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সাথে ওই অভিযোগের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, জানতে চাইলে তাহসিফ বলেন, এমনটি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে সবকিছু প্রকাশ করতে পারবেন না বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘যে ঘটনাগুলো ৫ আগস্টের আগে-পরে ঘটেছিল। সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপরাগতা আছে।’

এদিকে, নিজেকে তাহসিফের বন্ধু দাবি করা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কে এস এম ইনতিসার ইনজামাম ফেসবুকে দেওয়া এক বক্তব্যে তাহসিফের মৃত্যুর সাথে শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে দেশত্যাগের ভিডিও ফাঁসের ঘটনার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন। ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বলেও মনে করেন তিনি। তবে এসব বক্তব্য তার ব্যক্তিগত সন্দেহ ও ধারণার ভিত্তিতে দেওয়া। এর পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কালবেলা।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে উত্তরখান থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানান।

নৌ-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরের মাধ্যমে খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা উত্তরখান থানাধীন রাজাবাড়ি ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে পৌঁছান। পরে সেখান থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধারের সময় তাহসিফের পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। তার হাতে ঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। পরে সাথে থাকা ফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, নিখোঁজ হওয়ার পর তার সাথে কী ঘটেছিল এবং পরিবারের উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে কি না, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।