আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে তার এই ঘোষণা বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও সংশয়। দেশে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে, বাতিল করা হয়েছে পাসপোর্ট। অন্যদিকে, ভারত থেকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও অনিশ্চিত। ফলে তিনি কীভাবে দেশে ফিরবেন, সে সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর করতে পারবেন- তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। তার দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। দলটি মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল করলেও প্রকাশ্যে বড় ধরনের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন করতে পারেনি। অন্যদিকে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। এসব দলের মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থান ও স্বার্থের ভিন্নতা থাকলেও শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানে এক ধরনের মিল রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরা সহজ হবে না। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রাজনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ৬৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৫৩টি। মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে।
বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, প্রত্যর্পণ চুক্তির মাধ্যমে ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। তবে শেখ হাসিনা নিজে যেভাবে দেশে ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার কথা বলছেন, তা তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলে আসছেন, দলীয় কর্মীদের হতাশা কাটাতে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কথা বলছেন; তবে তিনি ঝুঁকি নিয়ে ফিরবেন না।
প্রত্যর্পণ চুক্তিতে কতটা সম্ভব?
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সাল থেকে প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় দুই দেশ প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত, পলাতক আসামি ও বন্দিদের একে অপরের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। ২০১৫ সালে এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে গ্রেফতার হওয়া আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার নেতা অনুপ চেটিয়াকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল।
বিএনপি সরকার গত ১০ মাসে কয়েক দফায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতকে চিঠি দিয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারও ১৮ মাসের শাসনামলে একাধিকবার একই অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে ভারত এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক বা নেতিবাচক জবাব দেয়নি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বিষয়টিকে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, ভারত এখনো কোনো জবাব দেয়নি, আবার শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না বলেও জানায়নি।
তবে বিএনপি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন মনে করেন, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার সম্ভাবনা কার্যত নেই। সাবেক কূটনীতিকদের একাংশের ধারণাও একই রকম। তাদের মতে, ভারত রাজনৈতিক বিবেচনায় তাকে আশ্রয় দিয়েছে। ফলে শুধু আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে তাকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা কম।
চুক্তিতে রাজনৈতিক প্রকৃতির অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। তবে হত্যা, গুম, বোমা বিস্ফোরণ ও সন্ত্রাসবাদের মতো কিছু অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার বিধানও রয়েছে। পাশাপাশি, ন্যায়বিচারের স্বার্থে সরল বিশ্বাসে অভিযোগ আনা হয়নি বলে মনে হলে অনুরোধ নাকচ করার সুযোগও চুক্তিতে রাখা হয়েছে।
পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস দেবে সরকার?
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার বাইরে শেখ হাসিনা নিজ উদ্যোগে দেশে ফিরতে চাইলে তার পাসপোর্ট অথবা ট্রাভেল পাস প্রয়োজন হবে। তার রেড পাসপোর্ট ও সাধারণ পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে। ফলে দেশে ফেরার জন্য তাকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে নতুন পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাসের আবেদন করতে হতে পারে।
এ ধরনের আবেদন এলে বিএনপি সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, আবেদন পেলে আইনগত দিক পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে বিষয়টি শুধু আইনি নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করবে।
শেখ হাসিনা কি সত্যিই ফিরতে চান?
শেখ হাসিনা কয়েক দফায় ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, নিজের বয়স এবং দলকে রাজনীতিতে ফেরানোর লক্ষ্য থেকেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভারতে অবস্থানরত দলটির একজন নেতা বিবিসিকে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের পক্ষে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সমর্থন আদায়ে কয়েক মাস ধরে বৈঠক করেছেন।
পশ্চিমা একটি দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের আরেক নেতার দাবি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শেখ হাসিনা পরিবার ও ভারতের সাথেও আলোচনা করেছেন। তবে দেশে ফেরার প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য বাধা কিংবা দিনক্ষণ নিয়ে দলের নেতাদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেননি।
আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করেন, দেশে ফেরার প্রক্রিয়া এবং কোনো বাধা তৈরি হলে বিকল্প ব্যবস্থা-সবকিছুই শেখ হাসিনা ঠিক করে রেখেছেন। তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তিনি বিষয়গুলো নিয়ে অন্যদের সাথে আলোচনা করছেন না।
দলটির অন্যতম মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ঝুঁকি থাকলেও শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। এ সিদ্ধান্তে তিনি অটল রয়েছেন। সে লক্ষ্যে সারাদেশে দলকে সাংগঠনিকভাবে গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ভারত ও ভূ-রাজনীতির ভূমিকা
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি শুধু তার নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না বলে মনে করছেন বাংলাদেশের রাজনীতিকদের কেউ কেউ। তাদের মতে, এ ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রকেও সম্ভাব্য প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করছেন।
ভারত ও পশ্চিমা দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার নিজের। তবে ভারতের ভূমিকা নিয়ে তারা স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের কয়েকজন রাজনীতিক মনে করেন, শেখ হাসিনার নিরাপত্তা এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
ডিসেম্বর ঘিরে সতর্কতা
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বর মাস ঘিরে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কেউ কেউ। তাদের আশঙ্কা, আওয়ামী লীগ গোপন তৎপরতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস ছাড়া বিমান কিংবা স্থলপথে শেখ হাসিনার দেশে প্রবেশের সুযোগ থাকবে না। এ অবস্থায় তিনি সমর্থকদের নিয়ে ভারতের কোনো বিমানবন্দর বা স্থলসীমান্তে এসে পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করতে পারেন-এমন আশঙ্কাও তারা বিবেচনায় রাখছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের তৎপরতা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, সরকারও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সতর্কতা বাড়াতে পারে। ফলে ডিসেম্বর মাসে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

