সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স। বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত এই টাস্কফোর্সের তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন মঙ্গলবার হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তদন্ত প্রয়োজন। প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। তদন্ত শেষ করতে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাস সময় দিয়েছেন আদালত। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো সময় পেল তদন্ত দল। পরবর্তী আদেশের জন্য ২০২৭ সালের ২৯ এপ্রিল তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
আদালত সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও প্রসিকিউশন কর্মকর্তাদের ওই দিন উপস্থিত থেকে তদন্তের অগ্রগতি জানাতে বলেছেন বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
৯০ জনকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, নতুন করে তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টাস্কফোর্স ৯০ জন সাক্ষীকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। পাশাপাশি ২৪ জনের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে।
তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার সঙ্গে আলোচনায় সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে জিয়াউল আহসান ও একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হয়। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে সংগৃহীত তথ্য ও আলামত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।
প্রায় ৩০০টি সিডি পর্যালোচনার অপেক্ষা
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে কিছু ডিজিটাল আলামত উদ্ধার করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন। এসব আলামতের মধ্যে জিওলোকেশন-সংক্রান্ত তথ্য, খুদে বার্তা এবং কল ডিটেইল রেকর্ডের (সিডিআর) মুদ্রিত কপি রয়েছে বলে আদালতে উপস্থাপিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছে থাকা প্রায় ৩০০টি সিডি পর্যালোচনার বিষয়টিও আদালতে তুলে ধরা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সিডির সবগুলো এখনো পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অবশিষ্ট আলামত বিশ্লেষণ করে সেগুলোর গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করতে আরও সময় প্রয়োজন।
পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আজিজুল হকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের কাছে থাকা আলামত চেয়েছেন। এ বিষয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
এক বছরের আবেদন, ছয় মাস সময়
রাষ্ট্রপক্ষ তদন্ত শেষ করতে এক বছর সময় চেয়েছিল। তবে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত ছয় মাস সময় মঞ্জুর করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ তদন্তে অগ্রগতির কথা জানিয়েছে এবং প্রায় ৩০০টি সিডির মধ্যে ৯০টি পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে আদালতকে জানিয়েছে। বাকি ২১০টি সিডি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহের জন্য সময় চাওয়া হয়।
তিনি বলেন, তদন্তে কারও নাম উঠে আসা আর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। পরবর্তী শুনানিতে সিডি পর্যালোচনার ফলাফল আদালতকে জানানো হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শিশির মনির আরও জানান, আগামী ২৯ এপ্রিল তদন্তের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা আদালতে উপস্থিত হয়ে এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য ও অগ্রগতি তুলে ধরবেন। পর্যালোচনায় প্রাসঙ্গিক প্রমাণ পাওয়া গেলে তা আদালতে উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
২০১২ সালে খুন হন সাগর-রুনি
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। সে সময় সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনে এবং রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।
দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষ হয়নি। সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনে কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রাথমিক তথ্য যাচাইয়ের কথা জানানো হয়েছে। এখন ডিজিটাল আলামত পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহের মাধ্যমে তদন্ত কতটা এগোয়, সেদিকেই নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।


