মুম্বাইয়ের প্রভাবশালী ও ধনী পার্শি পরিবার। সেই পরিবারের ১৬ বছরের কিশোরী রতনবাই পেটিট। আর তার চেয়ে প্রায় ২৪ বছরের বড়, তৎকালীন সময়ের খ্যাতনামা ব্যারিস্টার মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। বয়সের বিশাল ব্যবধান, ধর্মীয় ভিন্নতা ও পরিবারের তীব্র আপত্তি- কোনো কিছুই থামাতে পারেনি তাদের প্রেমকে।
শেষ পর্যন্ত বাবার প্রবল বিরোধিতা উপেক্ষা করে জিন্নাহর হাত ধরেছিলেন রতি। কিন্তু যে প্রেমের জন্য এত লড়াই, সেই সম্পর্কের শেষটা হয়েছিল গভীর বেদনায়। মাত্র ২৯ বছর বয়সে মৃত্যু হয় রতি জিন্নাহর। আর তার শেষযাত্রায় জনসমক্ষে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন জিন্নাহ।
ঘটনার শুরু ১৯১৬ সালের দিকে। মুম্বাইয়ের ধনী ব্যবসায়ী স্যার দিনশা পেটিট বন্ধু ও ব্যারিস্টার মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে দার্জিলিং ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে ছিলেন দিনশার ১৬ বছর বয়সী মেয়ে রতিও।
দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি পরিবেশেই রতি ও জিন্নাহ একে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তখন জিন্নাহর বয়স প্রায় ৪০ বছর। অন্যদিকে রতি ছিলেন মাত্র ১৬ বছরের কিশোরী।
একদিন নৈশাহারের সময় জিন্নাহ দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে বিয়ের বিষয়ে স্যার দিনশার মতামত জানতে চান। দিনশা জানান, এমন বিয়ে হলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য আরও দৃঢ় হতে পারে।
এই উত্তর পাওয়ার পরই জিন্নাহ নিজের মনের কথা জানান। তিনি দিনশাকে বলেন, তার মেয়েকে বিয়ে করতে চান।
কিন্তু এমন প্রস্তাবে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন দিনশা। অতিথি জিন্নাহকে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন তিনি। এরপর মেয়েকে জিন্নাহর সাথে দেখা করতেও নিষেধ করে দেন। এমনকি রতি প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত জিন্নাহ যেন তার সাথে দেখা করতে না পারেন, সে জন্য আদালতের আদেশও নেওয়া হয়।
তবে বাবার কঠোর নিষেধাজ্ঞাও রতি ও জিন্নাহর যোগাযোগ থামাতে পারেনি। তারা গোপনে দেখা করতেন, চিঠি আদান-প্রদানও চলত। একবার রতির হাতে জিন্নাহর চিঠি দেখে ফেলেছিলেন দিনশা। চিঠিটি কে দিয়েছে, তা বুঝতে পেরে মেয়ের কাছ থেকে সেটি নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু রতি চিঠিটি তার হাতে দেননি।
শেষ পর্যন্ত রতি ১৮ বছরে পা দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন দুজন। ১৯১৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার দিন রতি বাবার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যান। সাথে ছিল একটি ছাতা ও এক জোড়া পোশাক।
এরপর জিন্নাহ তাকে জামিয়া মসজিদে নিয়ে যান। রতি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ১৯১৮ সালের ১৮ এপ্রিল তাদের নিকাহ সম্পন্ন হয়।
এই বিয়ে সে সময় পুরো ভারতজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। একদিকে বয়সের বড় ব্যবধান, অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা এবং রতির পরিবারের তীব্র বিরোধিতা- সব মিলিয়ে জিন্নাহ ও রতির বিয়ে পরিণত হয়েছিল আলোচিত ঘটনায়।
নিকাহনামায় ১০০১ টাকা মোহরের কথা উল্লেখ থাকলেও জিন্নাহ রতিকে উপহার দিয়েছিলেন এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। সে সময়ের হিসেবে যা ছিল বিশাল অঙ্ক।
বিয়ের পরের সময়টা ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় অধ্যায়গুলোর একটি। বিভিন্ন স্মৃতিচারণে রতি ও জিন্নাহকে হাসিখুশি ও পরস্পরের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত দম্পতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। রতির সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বও সে সময়ের সমাজে ব্যাপকভাবে আলোচিত ছিল।
রতি ছিলেন স্পষ্টভাষী ও আত্মবিশ্বাসী। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি সহজেই সবার নজর কাড়ত। এক অনুষ্ঠানে স্ত্রীকে নিয়ে জিন্নাহর অবস্থানও আলোচিত হয়ে ওঠে। রতির পোশাক নিয়ে আয়োজকদের একজন মন্তব্য করলে জিন্নাহ স্ত্রীকে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন এবং এরপর ওই সরকারি ভবনে আর যাননি।
তবে সময়ের সাথে তাদের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। জিন্নাহর ব্যস্ত রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবন, তাদের বয়সের বড় ব্যবধান এবং রতির অসুস্থতা- সবকিছু মিলিয়ে দাম্পত্যে আগের উচ্ছ্বাস ধীরে ধীরে কমে আসে।
রতি একসময় ফ্রান্স থেকে দেশে ফেরার পথে জিন্নাহকে একটি আবেগঘন চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি স্বামীর প্রতি নিজের গভীর ভালোবাসা ও অভিমান প্রকাশ করেন।
১৯২৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মাত্র ২৯ বছর বয়সে মারা যান রতি জিন্নাহ। তার শেষ সময়গুলো ছিল বিষণ্নতায় ঘেরা। পরে তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে আত্মহত্যার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সে সময় দিল্লিতে ছিলেন জিন্নাহ। স্ত্রীর অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত মুম্বাইয়ের উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু পথেই একের পর এক শোকবার্তা পেতে থাকেন। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, রতি আর নেই।
মুম্বাই পৌঁছে জিন্নাহ সোজা কবরস্থানে যান। সেখানে রতির শেষকৃত্যের জন্য অপেক্ষা করছিলেন স্বজনরা। সবচেয়ে কাছের আত্মীয় হিসেবে জিন্নাহকে যখন কবরে মাটি দেওয়ার অনুরোধ করা হয়, তখন তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন।
যে জিন্নাহকে সাধারণত আবেগ প্রকাশ করতে দেখা যেত না, সেই মানুষটিই সেদিন জনসমক্ষে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, সেটিই ছিল জনসমক্ষে জিন্নাহর নিজের আবেগ প্রকাশের প্রথম এবং শেষ দৃশ্যগুলোর একটি।



