...|...|...

ক্যাম্পাস

জবির ফয়জুন্নেসা হলের দুই লিফট বন্ধ, ভোগান্তিতে ১২০০ শিক্ষার্থী

জবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১:৪৮
Shares
জবির ফয়জুন্নেসা হলের দুই লিফট বন্ধ, ভোগান্তিতে ১২০০ শিক্ষার্থী

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) একমাত্র নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলের চারটি লিফটের মধ্যে দুটি বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রায় ১২০০ আবাসিক শিক্ষার্থী। ১৬ তলা ভবনটির বাকি দুটি লিফট চালু থাকলেও সেগুলো সব তলায় একসাথে যাতায়াত না করায় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে লিফট পরিবর্তন করে কাঙ্ক্ষিত তলায় যেতে হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, চালু থাকা দুটি লিফটের একটি জোড় সংখ্যার তলা এবং অন্যটি বিজোড় সংখ্যার তলায় চলাচল করে। ফলে নির্দিষ্ট তলায় যেতে শিক্ষার্থীদের এক লিফট থেকে অন্য লিফটে উঠতে হচ্ছে। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে লিফটের সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। এতে ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রমে সময়মতো অংশ নেওয়া নিয়ে সমস্যায় পড়ছেন তারা।

শুধু লিফট সংকট নয়, চালু থাকা লিফটগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, চলাচলের সময় মাঝে মাঝে লিফটে তীব্র ঝাঁকুনি ও অস্বাভাবিক শব্দ হয়। কয়েকবার লিফটের ভেতরে শিক্ষার্থীরা আটকে পড়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে লিফট ব্যবহারের সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।

জবির ১৬তম আবর্তনের শিক্ষার্থী মোছা. রোমানা আক্তার বলেন, ‘হলের উচু তলার শিক্ষার্থীদের জন্য লিফট ছাড়া নিয়মিত চলাচল করা কঠিন। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক আমাদেরকে বিভিন্ন তলায় যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু চারটি লিফটের মধ্যে দুটি বন্ধ থাকায় দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ক্লাস, পরীক্ষা এবং সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। এতে অনেকসময় আমাদের ক্লাসে যেতে দেরি হয় এবং পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। অসুস্থ বা শারীরিকভাবে অসুবিধায় থাকা শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি আরও বেশি।’

লিফটের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জবির ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মোছা. নাবিলা আক্তার বলেন, ‘চলাচলের সময় কখনো কখনো লিফটে হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। লিফট স্বাভাবিকভাবে কাজ না করা, হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শিক্ষার্থীদের ভেতরে আটকে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি পরীক্ষা ছাড়া এ ধরনের সমস্যা অব্যাহত থাকলে আমরা বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছি। পাশাপাশি লিফটের ভেতরের ফ্যানগুলোর বেশিরভাগ সময়ই নষ্ট থাকে। বিশেষ করে ভিড়ের সময় আমাদের আরও বেশি অস্বস্তিতে পড়তে হয়। আমরা যথাসম্ভব দ্রুত এই সমস্যার সমাধান চাই।’

জবির ২০তম আবর্তনের শিক্ষার্থী নাদিয়া আফরিন কেয়া বলেন, ‘হলের লিফট এখন আমাদের কাছে আতঙ্কের একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি নিজে ১২ তলায় থাকি। একাধিকবার লিফট ৯ তলায় গিয়ে আটকে গেছি। আবার কখনো ৫ তলায় গিয়েও আটকে পড়েছি। এছাড়াও লিফট চলাচলের সময় মাঝে মাঝে এত বেশি শব্দ ও ঝাঁকুনি হয় যে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে হয়। এভাবে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে আমাদের চলতে হচ্ছে। বিষয়টি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। আশা করি প্রশাসন অতি দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

শিক্ষার্থীদের দাবি, অচল দুটি লিফট দ্রুত মেরামত করে চারটি লিফটই সচল করতে হবে। পাশাপাশি সব লিফটের মোটর, ব্রেক, কেবল, সেন্সর, দরজা ও কন্ট্রোল সিস্টেমসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের পূর্ণাঙ্গ কারিগরি পরীক্ষা করতে হবে।

এছাড়াও লিফটের ভেতরে জরুরি ফোন, ইন্টারকম ও অ্যালার্ম ব্যবস্থা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, শুধু লিফট সচল করাই যথেষ্ট নয়, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা পরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে লিফটে আটকে পড়লে দ্রুত উদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে।

শিক্ষার্থীরা দ্রুত সমস্যার সমাধান করে চারটি লিফট সচল এবং নিরাপদ করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, লিফটের যান্ত্রিক ত্রুটি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি যথাযথভাবে পরীক্ষা না করে ব্যবহার অব্যাহত রাখলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হল সংসদের ভিপি জান্নাতুল উম্মি তারিন বলেন, ​‘হলের লিফট সমস্যা নিয়ে আমরা প্রায় তিন মাস আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে বারবার কথা বলে আসছি। এমনকি গত ৪ তারিখে ভিসি স্যার এবং প্রধান প্রকৌশলী হলে আসলে তাদের কাছেও হলের লিফটের চরম ভোগান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সম্প্রতি এক শুক্রবারে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চারটি লিফটই পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ​হল প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে এসব কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। মূলত চুক্তি নবায়ন ও কারিগরি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই সংকট ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কয়েকদিন আগে ট্রায়ালের নামে কিছু কাজ করার কথা বলা হলেও বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হলে প্রশাসন থেকে স্বতন্ত্র কোনো ব্যবস্থাপনা সুবিধা পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিন ধরে হল ফান্ড বা অন্যান্য বরাদ্দের বিষয়ে দাবি জানালেও আমরা আশানুরূপ সহযোগিতা পাচ্ছি না। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে লিফটগুলোর স্থায়ী মেরামত ও নিয়মিত কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।’

এ বিষয়ে জানতে নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আঞ্জমান আরার সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও শারিরীক অসুস্থতার কারনে এ বিষয়ে তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে হলের আবাসিক শিক্ষক অধ্যাপক ড. বুশরা জাহান বলেন, ‘আমাদের ১৬ তলা হলের ধারণক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। এই সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে গিয়ে লিফটগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যার ফলে মাঝেমধ্যে কারিগরি ত্রুটি বা সমস্যা দেখা দেয়। লিফট ডোর সেন্সরে ময়লা জমা বা অনবরত ব্যবহারে এ ধরনের সমস্যা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে কোনো সমস্যা তৈরি হলে হল প্রশাসন ও স্টাফরা তাৎক্ষণিকভাবে তা সমাধানের চেষ্টা করে। লিফটের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে প্রকৌশল দফতর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ​‘হলের লিফট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে নতুন কোম্পানিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে নতুন করে দুটি লিফট অচল হয়ে থাকার বিষয়ে আমাদের এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য বা অভিযোগ আকারে জানানো হয়নি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে আমরা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।’