পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়ানো চীনের অত্যন্ত গোপনীয় একটি মহাকাশযানের ছবি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ‘শেনলং’ নামের মনুষ্যবিহীন এই মহাকাশযান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ওয়াশিংটনে। মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা, মহাকাশযানটি শুধু গবেষণার কাজে নয়, বরং কক্ষপথে স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন বস্তুর সাথে যোগাযোগ ও সেগুলো মোতায়েনের সক্ষমতাও অর্জন করেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের মহাকাশবিষয়ক হুমকি নিয়ে প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে ছবিটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রকাশিত ছবিটি ২০২৪ সালে মার্কিন বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ইমেজিং প্রতিষ্ঠান ভ্যান্টরের তোলা। প্রতিষ্ঠানটির আগের নাম ছিল ম্যাক্সার। ছবিতে ডানাযুক্ত একটি মহাকাশযান দেখা যায়, যার নকশার সাথে মার্কিন স্পেস ফোর্সের গোপন মহাকাশযান ‘এক্স-৩৭বি’র বেশ কিছু সাদৃশ্য রয়েছে।
মহাকাশযানটির কার্গো বে বা পেলোড বে দরজার উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। এর মাধ্যমে যানটির ভেতরে ছোট স্যাটেলাইট কিংবা অন্য কোনো মহাকাশযান বহন ও কক্ষপথে মোতায়েনের সক্ষমতা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে শেনলংয়ের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা কিংবা এর নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি চীন।
২০২০ সাল থেকে শেনলংয়ের অন্তত চারটি কক্ষপথ মিশনের তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ মিশনটি শুরু হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। প্রতিটি মিশন প্রায় নয় মাস স্থায়ী হয়েছে বলে মার্কিন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্যাটেলাইটের সাথে গোপন তৎপরতা
শেনলংয়ের সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের অন্যতম কারণ কক্ষপথে অন্য বস্তুর সাথে এর কথিত যোগাযোগ ও নৈকট্য বজায় রাখার কার্যক্রম।
মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (ডিআইএ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের নভেম্বরে শেনলংকে একটি সহচর স্যাটেলাইটের সাথে সমন্বিতভাবে চলতে দেখা যায়। একপর্যায়ে মহাকাশযানটি স্যাটেলাইটটির প্রায় এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান ধরে রাখে। পরে বস্তু দুটি একে অপরের ১০০ মিটারেরও কম দূরত্বে চলে আসে।
স্যাটেলাইটটিকে আলাদা করে দেওয়ার আগে শেনলংয়ের সাথে সেটির যোগাযোগ হয়েছিল বলে ধারণা করছেন মার্কিন গোয়েন্দারা।
মহাকাশে এ ধরনের কার্যক্রমকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ, একটি মহাকাশযান অন্য স্যাটেলাইটের কাছাকাছি গিয়ে সেটির সাথে যোগাযোগ করতে পারলে ভবিষ্যতে স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, মেরামত কিংবা কক্ষপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি সম্ভাব্য সামরিক কার্যক্রমেও এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব।
তবে শেনলং মহাকাশযানে কোনো অস্ত্র বহন করা হচ্ছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহাকাশে লেজার অস্ত্র তৈরি করছে চীন?
শুধু শেনলং নয়, মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে চীনের অন্যান্য প্রযুক্তিগত অগ্রগতিও তুলে ধরেছে ডিআইএ।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ডিরেক্টেড-এনার্জি ওয়েপন বা নির্দেশিত শক্তির অস্ত্রের কথা। এ ধরনের অস্ত্রে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজার কিংবা ঘনীভূত কণার রশ্মি ব্যবহার করে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুকে ক্ষতিগ্রস্ত বা অকার্যকর করা যায়।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, কক্ষপথে থাকা প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটকে অকার্যকর, ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধ্বংস করার লক্ষ্যে চীন এ ধরনের অস্ত্র তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতেও এ সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চালাবে।
মহাকাশ প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন নিজেদের স্বার্থে প্রভাবিত করাও বেইজিংয়ের কৌশলগত লক্ষ্য বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সাথে অন্য দেশগুলোর মহাকাশ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতাকে কাজে লাগিয়ে সামরিক ও কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে চায় চীন।
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে রাশিয়াকে ঘিরেও উদ্বেগ
ডিআইএর প্রতিবেদনে শুধু চীন নয়, রাশিয়ার মহাকাশ কর্মসূচি নিয়েও সতর্কতা প্রকাশ করা হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, মস্কো পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম মহাকাশভিত্তিক স্যাটেলাইট তৈরির কাজ করছে।
এ ধরনের কোনো অস্ত্র মহাকাশে বিস্ফোরিত হলে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার স্যাটেলাইট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, নেভিগেশন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায়।
গোয়েন্দা গবেষকদের মতে, তুলনামূলক কম উচ্চতায় মহাকাশে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটলে সৃষ্ট তীব্র বিকিরণ ও তড়িৎচৌম্বকীয় প্রভাবের কারণে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হতে পারে।
মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকানোর নিয়ম কোথায়?
১৯৬৭ সালে কার্যকর হওয়া আউটার স্পেস ট্রিটি বা মহাকাশ চুক্তিতে পৃথিবীর কক্ষপথ কিংবা অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর ওপর পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল এই চুক্তির মূল স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর অন্যতম।
তবে মহাকাশে প্রচলিত সামরিক কার্যক্রম, স্যাটেলাইটবিধ্বংসী প্রযুক্তি কিংবা বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে এখনো সর্বজনস্বীকৃত পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
চীন ও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশ মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধে নতুন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নিয়মকানুন তৈরির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকানোর কথা বললেও দেশ দুটি নিজেরাই মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে মহাকাশ এখন আর শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণা কিংবা যোগাযোগের ক্ষেত্র নয়; বরং বৈশ্বিক সামরিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হচ্ছে। চীনের শেনলং মহাকাশযানের ছবি প্রকাশ এবং রাশিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন উদ্বেগ সেই প্রতিযোগিতারই নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে।


