...|...|...

সারাদেশ

চারদিকে নদী, তবু সুপেয় পানির হাহাকার; প্রধানমন্ত্রীর সফরে সমাধানের আশা

খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:০৩
Shares
চারদিকে নদী, তবু সুপেয় পানির হাহাকার; প্রধানমন্ত্রীর সফরে সমাধানের আশা

চারদিকে নদী, তবু সুপেয় পানির হাহাকার। ছবি: টাইমস টুডে

চারদিকে নদী, বিস্তীর্ণ জলরাশি তবু এক কলস নিরাপদ খাবার পানির জন্য অপেক্ষা করতে হয় দিনের পর দিন। উপকূলীয় খুলনার দাকোপে পানির অভাব মানে শুধু পানির উৎসের অভাব নয়; লবণাক্ততা, সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা আর দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট মিলিয়ে সুপেয় পানি সংগ্রহ এখানকার বহু পরিবারের নিত্যদিনের চ্যালেঞ্জ।

বছরের ৯ থেকে ১০ মাসই নিরাপদ খাবার পানির সংকট থাকে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দাকোপের নলিয়ান সফর ঘিরে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে চালনা পৌরসভাসহ উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে। তাদের আশা, এবার হয়তো দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট লাঘবে নেওয়া হবে কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ।

দাকোপ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় প্রায় ৪৩ হাজার পরিবারের বিপরীতে অধিদফতরের উদ্যোগে প্রায় ৯ হাজার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে দুই হাজারের বেশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

অর্থাৎ, উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে মোট ১১ হাজারের কিছু বেশি সংরক্ষণব্যবস্থা রয়েছে। তবে এগুলোর কতটি বর্তমানে সচল, কতটি পরিবার নিয়মিত ব্যবহার করতে পারছে এবং অবশিষ্ট পরিবার কীভাবে নিরাপদ পানি সংগ্রহ করছে সেই পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানা প্রয়োজন।

এখানেই উঠে আসে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুরের পানি পরিশোধন কিংবা বিকল্প পানির উৎস তৈরির উদ্যোগ কতটা বিস্তৃত হলে দাকোপের প্রতিটি পরিবারের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছানো সম্ভব?

দাকোপ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি পুকুর খনন, পরীক্ষামূলক নলকূপ স্থাপন, পানির উৎসের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি ক্লিনিকে পানির উৎস স্থাপনে অগ্রগতি হলেও পরিবারভিত্তিক আরও প্রকল্প প্রয়োজন।

তার বক্তব্যে স্পষ্ট, শুধু নতুন পানির উৎস স্থাপন করলেই সংকটের সমাধান হবে না; প্রয়োজন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, উপযোগী প্রযুক্তি এবং পরিবার পর্যায়ে পানির ব্যবস্থা সম্প্রসারণ।

তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে কত অর্থ প্রয়োজন, কোন কোন এলাকায় সংকট সবচেয়ে বেশি এবং কত সময়ের মধ্যে পরিবারভিত্তিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা প্রকাশ করা হলে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা আরও বাস্তবভিত্তিক হবে।

দাকোপের সুপেয় পানির সংকটের বিষয়টি জাতীয় সংসদেও তুলে ধরেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ আমীর এজাজ খান। তিনি বলেন, আমার সংসদীয় এলাকার অসহায় মানুষ নদীভাঙন আর লবণাক্ততার সাথে নিরন্তর লড়াই করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। আমার এলাকার মানুষের প্রধান সমস্যা বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। এ সংকট সমাধানের জন্য আমি সম্প্রতি মহান সংসদে ২০ হাজার রেইনওয়াটার হারভেস্টিং ব্যবস্থা স্থাপনের চাহিদা তুলে ধরেছি। আশা করছি, আগামীতে এ পানির সংকট অনেকাংশে সমাধান হবে।

সংসদ সদস্যের এই দাবি বাস্তবায়িত হলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে প্রস্তাবিত ব্যবস্থাগুলো কোন কোন এলাকায় স্থাপন করা হবে, অগ্রাধিকার পাবেন কারা, অর্থায়ন কীভাবে হবে এবং বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে কারা থাকবেন এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

দাকোপের মানুষের কাছে সুপেয় পানির সংকট কোনো মৌসুমি অসুবিধা নয়; এটি জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। তাই প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে তাদের প্রত্যাশাও শুধু নতুন ঘোষণা বা প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা চান, নিরাপদ পানি সংগ্রহের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠুক এবং সেই ব্যবস্থার সুবিধা পৌঁছাক প্রত্যন্ত এলাকার পরিবারগুলোর কাছেও।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা যুক্ত করে সংকটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা গেলে পরিকল্পনা গ্রহণে অগ্রাধিকার নির্ধারণ সহজ হবে। একইসাথে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়, বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই এবং নতুন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করাও প্রয়োজন।

দাকোপে পানির সংকট নিরসনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায় হলেও এলাকার বাস্তবতা অনুযায়ী নিরাপদ বিকল্প উৎস, পানি পরিশোধন, সংরক্ষণব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবারভিত্তিক সুবিধা নিশ্চিত করার সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর নলিয়ান সফরকে ঘিরে উপকূলবাসীর প্রত্যাশা এখন একটাই দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট যেন আর শুধু আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রয়োজন এমন কার্যকর উদ্যোগ, যার সুফল তারা প্রতিদিনের জীবনে অনুভব করতে পারবেন।