চরমোনাইপন্থী বক্তা হাবিবুর রহমান মিসবাহর ৯ বিয়ে ও কাবিননামা নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন তার বিরুদ্ধে মামলাকারী সাবেক স্ত্রী নাইমা জান্নাত।
শনিবার (২২ আগস্ট) ‘উম্মে আফরাদ’ নামের একটি ফেসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে তিনি এসব প্রশ্ন ও অভিযোগ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে মিসবাহর দেওয়া মুবাহালার আহ্বান গ্রহণের ঘোষণাও দেন নাইমা।
টাইমস টুডের পাঠকদের জন্য পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
মোবাহালা গ্রহণ করলাম। হাবিবুর রহমান মিছবাহ মুবাহালার ঘোষণা দিয়েছেন এবং তার বক্তব্যকে মিথ্যা মনে করলে আমাকে মুবাহালায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আমি তার সেই আহ্বান গ্রহণ করছি। তবে মুবাহালার আগে তার বক্তব্যের কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
১. আংটির বিষয় ও ‘কুল্লামার তালাক’ এর কসম এর কথা মনে আছে?
হাবিবুর রহমান মিছবাহ এর আগেও আঙটির বিষয় ও আমাকে সাথে রাখা নিয়ে ‘কুল্লামার তালাক’ এর কসম খেয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘নাইমা আমার কাছে নেই’, তার কথাটি এক অর্থে ঠিক ছিল। কারণ তখন আমি তার কাছে ছিলাম না; আমাকে তিনি পাশের অন্য একটি রুমে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, ইলমুল মানতিক খাটিয়ে নিজের আকামকে ঢাকার চেষ্টা করেছিলেন। অথচ আমি তখনও তার স্ত্রী ছিলাম না। শব্দের ব্যাখ্যা দিয়ে বক্তব্যকে সত্য প্রমাণ করার চেষ্টা করলেই কি কসম হয়ে যায়? আল্লাহ কি জানেন না আসল সত্য? তিনি দেখেননি? তার একটু আগের ঘটনা। তখন আমি ইদ্দতকালীন ছিলাম। মিছবাহ তখন আমার সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মতোই ছিলেন। প্রথমে আমাকে মাওলানা মুসাদ্দেক সাহেবের বাসায় আমাকে তার স্ত্রী পরিচয়েই নিয়ে উঠেছিলেন। সেখানেই আমার সাথে পিরিয়ড অবস্থায় প্রথম অবৈধ মেলামেশা করেন। আমি বারবার বলেছি আমি অসুস্থ। কিন্তু তিনি মানেন নি।
আমাকে জোরপূর্বক আটকে রেখেছেন। এরপর খলিল যখন আমাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়, তখনও মিছবাহ আমার রুমেই ছিলেন। খলিল রুমের ভেতরে প্রবেশ করেননি; দরজা থেকেই আমাকে নিয়ে গেছেন। তাহলে শুধু ‘নাইমা আমার কাছে নেই’ এই বাক্যের কারিগরি ব্যাখ্যা দিয়ে সেই সময়ের বাস্তবতাকে কি অস্বীকার করা যায়? সেই কুল্লামার তালাকের ব্যাপারে আলেমরা ব্যাখা দিবেন। ফতুয়া দিবেন।
২. আজকের মুবাহালায় ‘৯ বিয়ে’র বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হলো কেন?
মিছবাহ বলেছেন, ‘আমার ৯ বিয়ের তথ্য মিথ্যা।’ আমার সরল প্রশ্ন- ৯টির বেশি, নাকি ৯টির কম? তিনি নির্দিষ্ট সংখ্যার বাইরেও উল্লেখ করলেন না কেন? এখানেও কি ইলমুল মানতিকের কারসাজি আছে? তিনি তো এর আগেও বারংবার কসম কেটে বলেছেন, ‘আমার মনে কী আছে, সেটা তো আমিই জানি।’ এমনকি সেই কুল্লামা তালাকের কসম নিয়ে বারবার তাকে আমি যখন জিজ্ঞেস করতাম তিনি সাথে সাথেই রাগারাগি শুরু করতেন। তাহলে আজও কি এমনভাবে বক্তব্য দেওয়া হলো, যাতে পরবর্তীতে বলা যায় ‘আমি তো ওই অর্থে বলিনি’? বা আমার মনে মনে অন্যকিছু ছিল?
৩. পরকীয়ার বিষয়েও তার বক্তব্য অসম্পূর্ণ
তিনি বলেছেন, ‘আমি কোনো পরকীয়া সম্পর্কে জড়িত নই।’ কিন্তু ‘এই মুহূর্তে কোনো পরকীয়া সম্পর্কে নেই’ এবং ‘কখনো কোনো পরকীয়া সম্পর্কে জড়িত ছিলাম না’ এই দুটি বক্তব্য এক নয়। এমনও হতে পারে তিনি এই মুহুর্তে স্ট্যাটাস লিখছেন, তিনিতো পরকীয়া করছেন না এই মুহূর্তে! তিনি যদি সত্যিই বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ অস্বীকৃতি জানাতে চান, তাহলে অতীতসহ পুরো বিষয়টি স্পষ্ট করা উচিত ছিল। তার ২০ বছর আগের প্রথম স্ত্রীও তার অতীতের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানেন এবং কথা বলেছেন। আর গত ৬ বছরে আমি নিজেও তাকে একাধিকবার অনৈতিক সম্পর্কে হাতেনাতে ধরেছি। তাহলে তিনি মুবাহালায় শুধু এমন একটি বাক্য কেন বললেন, যার ব্যাখ্যার সুযোগ পরবর্তীতেও থেকে যায়? আর লাস্ট পোস্ট কেন? আমার এই পোস্টের ব্যাখ্যাও দিতে বলেন।
৪. ‘বর্তমান দ্বিতীয় স্ত্রী’ এই বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন আছে।
মিছবাহ বলেছেন, ‘নাইমা জান্নাত ৫ম নন; তিনি আমার বর্তমান দ্বিতীয় স্ত্রী।’ আমি তার দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলাম এটি আমার বক্তব্য। কিন্তু তার সাথে আমার বিয়েটি তার পঞ্চম বিয়ে ছিল। তার অন্য স্ত্রীও এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে পারবেন। তাহলে ‘বর্তমান দ্বিতীয় স্ত্রী’ বলা আর ‘আমার সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে’ এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখানোর চেষ্টা কেন?
৫. কাবিন ও রেজিস্ট্রির বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘বিয়ের কাবিন এবং রেজিস্ট্রি আছে।’ যদি কাবিননামা ও রেজিস্ট্রি থাকে, তাহলে আমাকে তার কপি দেওয়া হয়নি কেন? তিনি কাবিননামা করেছেন কি না তিনি নিজেই ভালো জানেন। আমার সন্তানের জন্মনিবন্ধন পর্যন্ত করা হয়নি। এমনকি টিকার কার্ডও করা হয়নি। শুধু পোস্টে ‘কাবিন ও রেজিস্ট্রি আছে’ লিখে দিলেই বাস্তবতার সব প্রশ্নের উত্তর হয়ে যায় না। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যথাযথ জায়গায় উপস্থাপন করা হবে।
৬. যৌতুকের বিষয়টি তিনি যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, সেটিও অসম্পূর্ণ। মিসবাহ বলেছেন, ‘আমি নাঈমা জান্নাতের কাছে কোনো যৌতুক দাবি করিনি।’ কিন্তু বিষয়টিকে শুধু গতানুগতিক অর্থে ‘যৌতুক চাওয়া’ হিসেবে দেখলে পুরো অভিযোগটি বোঝা যাবে না। আমি যে মামলা করেছি, সেটি যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা। আইনের নির্দিষ্ট ধারায় অভিযোগের নির্দিষ্ট উপাদান থাকে। ‘আমি যৌতুক চাইনি’ এই একটি বাক্য দিয়ে মামলার সব অভিযোগের জবাব দেওয়া যায় না। এখানেও বিষয়টিকে শব্দের সংকীর্ণ অর্থে নিয়ে মূল অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে কি না সেটিও আদালতেই পরিষ্কার হবে।
৭. তার বাস্তব জীবন সম্পর্কে আমি একজন সাবেক স্ত্রী হিসেবে যা জানি, যারা তার মোবাহালার পোস্ট দেখে গদগদ করছেন তারা কী জানেন? আজ তার মুবাহালার পোস্ট দেখে অনেকেই গদগদ হয়ে সেটি গ্রহণ করছেন। কিন্তু তার স্ত্রী হিসেবে তার বাস্তব জীবন সম্পর্কে আমারই জানা থাকবে। তাদের নয়।
আমি তার স্ত্রী হয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছি- তিনি নিয়মিত নামাজ ঠিকভাবে পড়তেন না। অবসর সময় পেলেই সিনেমা দেখেন। অশ্লীল গালিগালাজ করেন এবং মোবাইলে বিভিন্ন ধরনের নাটক, সিরিয়াল এসব নিয়েই পড়ে থাকতেন। আমি কারও ঈমানের বিচারক নই। কিন্তু যখন তিনি নিজেকে সত্য-মিথ্যার প্রশ্নে আল্লাহর সামনে দাঁড় করিয়ে মুবাহালার আহ্বান জানান, তখন তার সাথে সংসার করা একজন সাবেক স্ত্রী হিসেবে আমার জানা বাস্তবতাগুলো বলার অধিকার আমারও আছে।
৮. এবার মুবাহালার বিষয়ে আমার কথা
আমি তার মুবাহালার আহ্বান সবকিছু জেনে-বুঝেই গ্রহণ করলাম। তিনি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তার বক্তব্য দিয়েছেন। আমিও আল্লাহকে সাক্ষী রেখে আমার বক্তব্য দিচ্ছি। হে আল্লাহ! আমি যদি সত্য বলে থাকি, জেনে-শুনে মিথ্যা অভিযোগ না করে থাকি এবং আমার বক্তব্য সত্য হয়ে থাকে, তাহলে আমাকে সত্যের ওপর অটল রাখুন এবং আমার ওপর কোনো লানত নাজিল করবেন না। আর আমি যদি জেনে-শুনে মিথ্যা বলে থাকি, কারও ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে থাকি, তাহলে আমার ওপরই আপনার লানত নেমে আসুক। আল্লাহুম্মা আমিন। মানুষ কার কথা বিশ্বাস করবে, সেটি মানুষের বিষয়। কিন্তু আল্লাহর সামনে কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী সেটি একমাত্র তিনিই জানেন। আর তার ইলমুল মানতিকের কাছে শয়তানও হয়তো হার মেনে যাবে; কিন্তু মহান আল্লাহর কাছে শব্দের কারসাজি চলে না। মুবাহালার আহ্বান তিনি জানিয়েছেন। আমি সেই আহ্বান গ্রহণ করলাম।
বাকি ফয়সালা মহান আল্লাহর হাতে। আইনের বিষয় আদালতে, আর সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত ফয়সালা আল্লাহর দরবারে। আল্লাহুম্মা আমিন।
— নাইমা জান্নাত



