ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন বিএনপির ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটি এক ঘণ্টার মধ্যে স্থগিত করা হয়েছে। সোমবার (১৭ আগস্ট) রাত সোয়া ১১টার দিকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম সিরাজ ও সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় সাহার স্বাক্ষরে কমিটিগুলো ঘোষণা করা হয়। ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে রাতেই কমিটিগুলো স্থগিত করা হয়।
উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে গুণবহা ইউনিয়নের সম্মেলন স্থগিত থাকায় বাকি নয়টি ইউনিয়নে ৩১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে এসব কমিটিতে আহ্বায়ক ছাড়া কোনো যুগ্ম আহ্বায়ক বা সদস্যসচিব রাখা হয়নি। বাকি সবাইকে সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ নিয়েও দলের ভেতরে প্রশ্ন ও সমালোচনা দেখা দেয়।
দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ঘোষিত কমিটিগুলোর কয়েকটিতে এমন ব্যক্তিদের আহ্বায়ক করা হয়েছে, যারা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাসিন্দা নন। একই সাথে উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কয়েকজন নেতাকে ইউনিয়ন পর্যায়ের আহ্বায়ক করা হয়েছে। এতে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ও গঠনতন্ত্রের বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী, পরমেশ্বরদী ও দাদপুর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় সাহাকে আহ্বায়ক করা হয়। শেখর ইউনিয়নে পৌর যুবদলের আহ্বায়ক জহিরুল ইকবাল ঠাকুর পিন্টু, চতুল ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসিবুজ্জামান শাহিন, ঘোষপুর ইউনিয়নে নজরুল ইসলাম, ময়না ইউনিয়নে পৌর বিএনপির সহসভাপতি খান আতাউর রহমান, সাতৈর ইউনিয়নে কৃষকদলের সভাপতি লুৎফর রহমান, সদর ইউনিয়নে যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম সম্রাট এবং রূপাপাত ইউনিয়নে আকরাম হোসেন মিয়াকে আহ্বায়ক করা হয়।
দলের কয়েকজন নেতা দাবি করেন, বিএনপির সাংগঠনিক বিধান অনুযায়ী একই ব্যক্তির একাধিক সাংগঠনিক কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় সাহার দুটি ইউনিয়নের আহ্বায়ক হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া অভিযোগ উঠেছে, ঘোষিত নয়টি কমিটির অধিকাংশ আহ্বায়কই সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা নন। স্থানীয় পর্যায়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে তৃণমূলের নেতৃত্ব নির্বাচনের পরিবর্তে উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের দিয়ে ইউনিয়ন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দলের একাংশের নেতাকর্মীরা।
কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা প্রকাশ্যে এর সমালোচনা করেন।
উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর মিনাজুর রহমান লিপন বলেন, বোয়ালমারী উপজেলা ও ইউনিয়ন বিএনপি এখন খন্দকার নাসিরুল ইসলামের পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। নয়টি ইউনিয়নের কমিটিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের কাউকে আহ্বায়ক করা হয়নি। কোনো কমিটিতেই সদস্যসচিব রাখা হয়নি। তিল তিল করে গড়ে ওঠা বিএনপিকে ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে।
সাবেক ছাত্রদল নেতা সাহাবুদ্দিন আহমেদ নিউটন মিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে ঘোষিত কমিটিগুলোর তীব্র সমালোচনা করেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক বোরহান উদ্দিন খান সৈকত বলেন, বোয়ালমারী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদত্যাগ করা উচিত। তাদের হঠকারিতার কারণে পুরো উপজেলা বিএনপি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
মহিলা দল নেত্রী মুন্নি রহমান বলেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এমন কমিটির নজির কোথাও আছে বলে জানা নেই। যে কমিটিতে শুধু আহ্বায়ক ও সদস্য, কিন্তু কোনো সদস্যসচিব নেই-এটি হাস্যকর ও অবাস্তব কমিটি।
যুবদল নেতা মো. সামিউল হক বলেন, ঘোষিত ইউনিয়নগুলোর আহ্বায়ক কমিটি দলের গঠনতন্ত্রপরিপন্থী। যারা উপজেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল।
তবে অভিযোগ ও সমালোচনার বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় সাহা বলেন, আসলে এটি আহ্বায়ক কমিটি নয়, সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি হওয়ার কথা ছিল। ভুলক্রমে আহ্বায়ক কমিটি লেখা হয়েছে। গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলকভাবে কাউন্সিল আয়োজনের উদ্দেশ্যে উপজেলা কমিটির নেতৃবৃন্দকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যাতে কেউ নিজের সুবিধামতো কমিটি গঠন করতে না পারেন। ভুলটি দৃষ্টিগোচর হওয়ায় কমিটি স্থগিত করা হয়েছে।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বলেন, অনিবার্য কারণে ঘোষিত কমিটি স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
এদিকে, সম্প্রতি উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে নয়টি ইউনিয়নে বিএনপির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঘোষিত কমিটি স্থগিতের পর নতুন করে ইউনিয়ন বিএনপির সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি কীভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় গঠন করা হবে, তা নিয়ে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

