স্বর্ণের কথা উঠলেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে নান্দনিক গহনা কিংবা চকচকে অলংকারের ছবি। হাজার বছর ধরে রূপচর্চা, সামাজিক মর্যাদা এবং নিরাপদ বিনিয়োগের প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে এই হলুদ ধাতুর কদর বিশ্বজুড়ে সর্বজনবিদিত। তবে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক সভ্যতায় স্বর্ণের ভূমিকা কেবল ভল্টের ভেতরে জমা রাখা স্বর্ণের বার বা গলার নেকলেসেই সীমাবদ্ধ নেই।
সম্প্রতি বিবিসি নিউজ বাংলা-র প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আমাদের প্রতিদিনের হাতের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে সুদূর মহাকাশ অভিযান, থালাবাসনের বিলাসী খাবার কিংবা মরণব্যাধি ক্যানসারের চিকিৎসাতেও অলক্ষ্যে জড়িয়ে আছে এই অমূল্য ধাতু।
এর পেছনে মূল কারণ হলো স্বর্ণের অনন্য ভৌত গুণাবলি—এটি সহজে ক্ষয় হয় না, মরিচা ধরে না, বিদ্যুৎ পরিবাহিতা অত্যন্ত উচ্চ এবং এটিকে পিটিয়ে অতি সূক্ষ্ম পাত বা তারে রূপ দেওয়া সম্ভব।
১. বিলাসিতা থেকে প্লেট: খাবারের টেবিলে ‘এডিবল গোল্ড’
সাধারণভাবে স্বর্ণ খাওয়ার বস্তু নয় মনে হলেও, বিলাসী গ্যাস্ট্রোনমিতে স্বর্ণের উপস্থিতি এখন বিশ্বজুড়ে বেশ জনপ্রিয়। খাবারে ব্যবহৃত এই স্বর্ণ অতিমাত্রায় বিশুদ্ধ (প্রায় ২২ থেকে ২৪ ক্যারেট) এবং অত্যন্ত পাতলা পাত হিসেবে তৈরি করা হয়, যা ‘এডিবল গোল্ড’ বা খাওয়ার উপযোগী স্বর্ণ নামে পরিচিত।
বিলাসী পরিবেশন: বিশ্বজুড়ে দামি রেস্তোরাঁয় সুশি, মিষ্টি, চকলেট, কেক কিংবা আইসক্রিম সাজাতে অতি পাতলা সোনার পাত, ছোট টুকরা, গুঁড়া বা পাপড়ির মতো করে এটি ব্যবহার করা হয়।
দক্ষিণ এশীয় ঐতিহ্য: আমাদের অঞ্চলে মিষ্টি ও ঐতিহ্যবাহী খাবার সাজাতে ব্যবহৃত ‘ভারক’ বা ‘ওয়ার্ক’ মূলত স্বর্ণ বা রুপারই অত্যন্ত সূক্ষ্ম পাত।
স্বাস্থ্যপ্রভাব ও অনুমোদন: ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাবারে ব্যবহৃত স্বর্ণ ‘ই১৭৫’ (E175) নামে একটি অনুমোদিত ফুড অ্যাডিটিভ। ধাতব স্বর্ণ পরিপাকতন্ত্রে শোষিত হয় না বলে এর বিশেষ কোনো পুষ্টিগুণ নেই; মূলত বিলাসিতা ও নান্দনিক সাজসজ্জার জন্যই এটি ব্যবহৃত হয়।
২০২৩ সালে পার্টিকল অ্যান্ড ফাইবার টক্সিকোলজি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে যে, এটি অন্ত্রের সরাসরি ক্ষতি না করলেও অতিরিক্ত গ্রহণে পরিপাকতন্ত্রের অনুজীবের ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।
২. প্রযুক্তির প্রাণশক্তি: স্মার্টফোন থেকে সার্কিট বোর্ড
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটারের ভেতরেও লুকিয়ে রয়েছে স্বর্ণ।
বিদ্যুৎ পরিবাহিতা ও স্থায়িত্ব: স্বর্ণ অত্যন্ত চমৎকার বিদ্যুৎ পরিবাহী এবং এতে সহজে মরিচা বা ক্ষয় ধরে না। ফলে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও কম্পিউটারের সার্কিট বোর্ড, কানেক্টর ও সংযোগস্থলে স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া হয়, যা বৈদ্যুতিক সংযোগ দীর্ঘদিন সচল রাখে।
ই-বর্জ্য থেকে পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ: একটি একক যন্ত্রে স্বর্ণের পরিমাণ খুব সামান্য হলেও, বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরির কারণে এই খাতে ব্যবহৃত স্বর্ণের মোট পরিমাণ অনেক বেশি। সে কারণেই বর্তমানে পুরোনো মোবাইল ও কম্পিউটার বর্জ্য (E-waste) থেকে স্বর্ণ সংগ্রহ করে তা পুনঃব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।
৩. মহাকাশ অভিযানে সোনালি ছোঁয়া: টেলিস্কোপ থেকে মহাকাশচারীর হেলমেট
পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশ গবেষণাতেও স্বর্ণ এক অপরিহার্য উপাদান।
জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ: মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্যানুযায়ী, স্বর্ণ আলো ও তাপ বিকিরণ খুব ভালোভাবে প্রতিফলিত করতে পারে। বিশেষ করে ইনফ্রারেড আলো প্রতিফলনে স্বর্ণের উচ্চ ক্ষমতার কারণে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের আয়নাগুলোতে স্বর্ণের অতি সূক্ষ্ম প্রলেপ দেওয়া হয়েছে, যা মহাবিশ্বের দূরবর্তী নক্ষত্র ও ছায়াপথ পর্যবেক্ষণে সাহায্য করে।
মহাকাশচারীদের সুরক্ষাকবচ: মহাকাশচারীদের ব্যবহৃত হেলমেটের স্বচ্ছ ফেস-শিল্ডে স্বর্ণের পাতলা প্রলেপ থাকে। এটি সানগ্লাসের মতো কাজ করে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি ও মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে মহাকাশচারীদের রক্ষা করে। এ ছাড়া মহাকাশযানের সংবেদনশীল যন্ত্রাংশেও স্বর্ ব্যবহৃত হয়।
৪. চিকিৎসাবিজ্ঞান ও রোগ নির্ণয়ে বিপ্লব
চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বর্ণের ব্যবহার নতুন নয়; তবে আধুনিক গবেষণায় এর ভূমিকা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
ক্যান্সার ও আধুনিক ন্যানো-প্রযুক্তি: যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, অতি ক্ষুদ্র ‘গোল্ড ন্যানোপার্টিকল’ ব্যবহার করে ক্যান্সার শনাক্তকরণ, শরীরের নির্দিষ্ট কোষে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এবং টিউমার চিকিৎসার গবেষণায় আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দ্রুত পরীক্ষার কিটে রঙিন রেখা তৈরিতেও স্বর্ণের ন্যানোকণা ব্যবহৃত হয়।
বাত রোগ ও ডেন্টাল কেয়ার: অতীতে 'গোল্ড সল্ট' রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতো। এ ছাড়া আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয়রোধী হওয়ার কারণে দাঁতের পুনর্গঠনে স্বর্ণের সংকর ধাতু ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরোনো।
৫. বিশ্ব অর্থনীতির মেরুদণ্ড: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ রিজার্ভ
গয়না বা প্রযুক্তির বাইরে বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় স্বর্ণের ভূমিকা অপরিসীম।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ: বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলার ও অন্যান্য মুদ্রার পাশাপাশি বিশাল পরিমাণ স্বর্ণ রিজার্ভ হিসেবে জমা রাখে।
শীর্ষ মজুদকারী দেশ: ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে (৮,১৩৩ টন)। আইএমএফের তথ্যমতে, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর গচ্ছিত সম্পদের ৭০ শতাংশেরই বেশি স্বর্ণনির্ভর।
চীনা রিজার্ভের দাপট: চীন সম্প্রতি দ্রুত গতিতে তাদের বৈশ্বিক রিজার্ভ স্বর্ণের ভান্ডারে রূপান্তর করছে; ২০২৪ সাল শেষে তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২,২৭৯ টনে।


