ক্রোয়েশিয়ার স্প্লিট শহরে ইহুদিবিদ্বেষী স্লোগান, নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের প্রশংসা এবং পুলিশের সাথে সংঘর্ষের ঘটনায় হাইদুক স্প্লিট ফুটবল ক্লাবের অন্তত ১২ সমর্থককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ডাচ ক্লাব আয়াক্সের বিপক্ষে ম্যাচকে কেন্দ্র করে সমর্থকদের এমন আচরণে দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। ঘটনাটি ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
১৬ অক্টোবর রাতে আয়াক্সের বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর আগে স্প্লিটে হাজারো সমর্থক ইহুদিবিদ্বেষী স্লোগান দেন এবং নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের প্রশংসা করে গান করেন। এ ঘটনার পর শুক্রবার পুলিশ ১২ জনকে সহিংসতা ও ঘৃণা উসকে দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতারের কথা জানায়। একই সাথে ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও গ্রেফতার করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সমর্থকদের একটি দল গাড়ির পেছনে মিছিল করে। গাড়ির ওপর রাখা একটি প্রতীকী কফিনে আয়াক্স দলের নাম লেখা ছিল। আমস্টারডামের ইহুদি সম্প্রদায়ের সাথে ঐতিহাসিকভাবে সম্পৃক্ত ক্লাবটিকে ঘিরে এমন প্রদর্শনীর পাশাপাশি সমর্থকেরা পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ান। ম্যাচ চলাকালে মাঠে আগুন জ্বালানো ফ্লেয়ার ও অন্যান্য বস্তু ছুড়ে মারায় খেলা ১২ মিনিটের জন্য বন্ধ রাখতে হয়।
শেষ পর্যন্ত উয়েফা কনফারেন্স লিগের ম্যাচে আয়াক্সকে ২-১ গোলে হারায় হাইদুক স্প্লিট। ১৬ বছর পর ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় নিজেদের মাঠে বড় কোনো ম্যাচ খেলতে নেমেছিল ক্রোয়েশিয়ার ক্লাবটি। তবে ম্যাচের ফলের চেয়ে সমর্থকদের আচরণই বেশি আলোচনায় এসেছে।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোরান মিলানোভিচ এবং দেশটির রক্ষণশীল সরকার। প্রেসিডেন্ট এ ঘটনায় এমন পদক্ষেপ ও শাস্তির আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে স্পষ্ট হয় ক্রোয়েশিয়ায় নাৎসিবাদের গৌরবগাথা প্রচারের কোনো জায়গা নেই।
ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে বলেছে, এ ঘটনা দেশের ফুটবলের ভাবমূর্তির ক্ষতি করেছে। সংস্থাটি সমর্থকদের আচরণকে খেলাধুলার মৌলিক মূল্যবোধ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও ঐক্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে।
হাইদুক স্প্লিটও সমর্থকদের আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। তবে ক্লাবটির দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড তাদের সব সমর্থকের মনোভাবের প্রতিফলন নয়। এক বিবৃতিতে ক্লাবটি বলেছে, “সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা আমাদের জন্য গর্বের বিষয় নয়, তবে একটি ক্লাব হিসেবে আমরা এর পরিণাম মেনে নিতে প্রস্তুত।”
ম্যাচে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং সমর্থকদের আচরণের কারণে হাইদুক স্প্লিটের বিরুদ্ধে উয়েফা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ক্রোয়েশিয়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের সহযোগী ক্রোয়েশিয়ার শাসনব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ইতিহাস এবং দেশটিতে জাতীয়তাবাদী ও উগ্র ডানপন্থী মনোভাবের বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে এসব প্রবণতা উপেক্ষা করার অভিযোগও উঠেছে, যদিও সরকার তা অস্বীকার করে আসছে।
ক্রোয়েশিয়ার জাতিগত সার্ব সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক নেতা মিলোরাদ পুপোভাচ বলেছেন, “স্প্লিটে যা ঘটেছে, সেই পর্যায়ে পৌঁছানোটা কেবল সময়ের ব্যাপার ছিল।”
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্রোয়েশিয়ার বন্দিশিবিরগুলোতে হাজার হাজার সার্ব, ইহুদি, রোমা জনগোষ্ঠীর মানুষ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী ক্রোয়াট নিহত হন। দেশটির কিছু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিপন্থী শাসনের ব্যবহৃত একটি স্লোগানকে সার্ব-নেতৃত্বাধীন সাবেক যুগোস্লাভিয়া থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
স্প্লিটের ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে জাগরেবে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাসও। এক বিবৃতিতে দূতাবাস জানিয়েছে, এ ঘটনায় তারা ‘গভীরভাবে মর্মাহত’ এবং ক্রোয়েশিয়া সরকারের কাছে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।



