...|...|...

অন্যান্য

কৈলাস-মানস সরোবর যে চার ধর্মের মানুষের কাছে তীর্থস্থান

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৩৩ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৮:৪৬
Shares
কৈলাস-মানস সরোবর যে চার ধর্মের মানুষের কাছে তীর্থস্থান

একই ফ্রেমে মানস সরোবর ও কৈলাস পর্বত। ছবি: সংগৃহীত

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে চার হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায় নীল জলরাশির এক হ্রদ ‘মানস সরোবর’। আর এর পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম ও পবিত্র শৃঙ্গ ‘কৈলাস পর্বত’। বছরের বড় একটা সময় তুষার আর বরফে ঢাকা থাকে এই ভৌগোলিক বিস্ময়।

দুর্গম উঁচু পাহাড়ি পথ, তীব্র ঠান্ডা, চরম আবহাওয়া এবং অক্সিজেনের স্বল্পতাসহ নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শত শত বছর ধরে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে যান এই অঞ্চলে। কেউ কৈলাস পর্বত প্রদক্ষিণ করেন, কেউ যান কেবল মানস সরোবরের তীরে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি বেশিরভাগ মানুষই সেখানে যান ধর্মীয় টানে। স্থানটি হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও তিব্বতের প্রাচীন বন ধর্মের অনুসারীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।

কোথায় অবস্থিত এই অঞ্চল?

কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবর দু'টিই তিব্বতে অবস্থিত, যা বর্তমানে চীনের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। তবে এটি নেপাল ও ভারতের সীমান্তের খুবই কাছাকাছি অবস্থিত। কৈলাস পর্বতের উচ্চতা প্রায় ৬,৬৩৮ মিটার (২১,৭৭৮ ফুট), যা এভারেস্টের চেয়ে দুই হাজার মিটারেরও বেশি নিচু।

এর ঠিক দক্ষিণে প্রায় ৪,৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত মানস সরোবর এশিয়ার উচ্চতম স্বাদু পানির হ্রদগুলোর একটি। এর আয়তন প্রায় ৪১২ বর্গকিলোমিটার। ইউনেস্কোর তথ্যানুযায়ী, মানস সরোবর, রাক্ষসতাল এবং কৈলাস অঞ্চল থেকেই এশিয়ার চারটি বড় নদী- সিন্ধু, শতদ্রু, ব্রহ্মপুত্র এবং কর্ণালীর উৎপত্তি হয়েছে।

চার ধর্মের কাছে কেন পবিত্র?

ইউনেস্কোর মতে, এই অঞ্চলে ধর্মীয় উপাসনার ইতিহাস প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে এর মাহাত্ম্য ভিন্ন হলেও স্থানটির প্রতি ভক্তি সবার সমান:

হিন্দু ধর্ম: হিন্দু ধর্মে কৈলাসকে দেবতা শিব ও দেবী পার্বতীর আবাসস্থল হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। ঋগ্বেদের যুগ থেকেই এর উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, মানস সরোবরের পানিকে পবিত্র মনে করে তীর্থযাত্রীরা পূজা করেন এবং বিশ্বাস করেন যে এখানে স্নান করলে পাপ থেকে মুক্তি মেলে।

বৌদ্ধ ধর্ম: তিব্বতি ভাষায় পর্বতটি 'কাং রিনপোচে' (তুষারের মূল্যবান রত্ন) নামে পরিচিত। বৌদ্ধদের একটি অংশ বিশ্বাস করেন, কৈলাস হলো পৌরাণিক মেরু পর্বত বা মহাবিশ্বের কেন্দ্র।

জৈন ধর্ম: জৈনদের বিশ্বাস, তাদের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভদেব এই স্থানে নির্বাণ লাভ করেছিলেন।

বন ধর্ম: তিব্বতের প্রাচীন বন ধর্মের অনুসারীদের কাছে কৈলাস তাদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র ও উপাসনার অন্যতম পবিত্র স্থান।

প্রদক্ষিণ বা ‘কোরা’র ভিন্নতা

তীর্থযাত্রীরা কৈলাসের চারপাশে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ প্রদক্ষিণ করেন। হিন্দু ও বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীরা সাধারণত ঘড়ির কাঁটার দিকে এই প্রদক্ষিণ করেন (তিব্বতি ঐতিহ্যে একে বলা হয় ‘কোরা’), অন্যদিকে বন ও জৈন অনুসারীরা ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করে থাকেন। প্রচণ্ড প্রতিকূলতা ও তিন দিনব্যাপী এই পথ পাড়ি দেওয়া বেশ কষ্টসাধ্য।

পৌঁছানো এত কঠিন কেন?

কৈলাস-মানস সরোবরে যাতায়াত বেশ জটিল। তিব্বত অঞ্চলটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হওয়ায় এবং কঠোর নিয়ম থাকার কারণে সেখানে যেতে চীনের ভিসা ছাড়াও বিশেষ অনুমতিপত্রের প্রয়োজন হয়। ভারতের নাগরিকরা নির্দিষ্ট পাস দিয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যেতে পারলেও বাংলাদেশসহ অন্যান্য বিদেশি তীর্থযাত্রীদের সাধারণত নেপাল হয়ে বা চীনের ভেতর দিয়ে অনুমোদিত ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে যেতে হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে তীর্থযাত্রায় যাওয়ার সময় আকস্মিক বন্যায় বিদেশি নাগরিকসহ অনেকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা স্থানটিকে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মানুষের আজন্মের আধ্যাত্মিক আকুলতা এই দুর্গম পথযাত্রাকে যুগ যুগ ধরে টিকিয়ে রেখেছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা