দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো মহাষ্টমী বা নবমী তিথির কুমারী পূজা। শত শত মানুষের সামনে সিংহাসনে বসিয়ে এক কুমারী কন্যাকে সাক্ষাৎ দেবী দুর্গা রূপে আরাধনা করা হয়। কিন্তু কেন জীবন্ত মানুষের পুজো করা হয়? আর কেনই বা এই পূজায় ব্যবহৃত মহাপ্রসাদ (ভোগ) রান্নার পেছনে রয়েছে কঠোর ও বিশেষ নিয়ম? চলুন জেনে নেওয়া যাক এর আদি ইতিহাস ও শাস্ত্রীয় কারণ।
কুমারী পূজার পেছনে রয়েছে সনাতন ধর্মের সুগভীর আধ্যাত্মিক দর্শন এবং কিছু পৌরাণিক কাহিনী।
কোলাসুর বধের ইতিহাস: পুরাণ অনুসারে, কোলাসুর নামক এক শক্তিশালী অসুর স্বর্গ-মর্ত্য দখল করে দেবতাদের ওপর অত্যাচার শুরু করে। দেবতারা তখন আদি শক্তি মহামায়ার শরণাপন্ন হন। দেবীর আশীর্বাদে এক কুমারী কন্যা রূপ ধারণ করে কোলাসুরকে বধ করেন। সেই থেকে কুমারী কন্যার মাধ্যমে মহাশক্তির আরাধনা শুরু হয়।
সনাতন দর্শনে নারীর স্থান: তন্ত্র ও পুরাণ মতে, পরমাত্মা বা আদি শক্তি কোনো নির্দিষ্ট মূর্তিতে সীমাবদ্ধ নন। সৃষ্টির আদি বীজ ও পবিত্রতার চরম রূপ নিহিত থাকে এক ঋতুপূর্ব কুমারী বালিকার মধ্যে। তাই নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বজনীন দেবত্ব জাগিয়ে তুলতেই এই পূজা করা হয়।
আধুনিক যুগে বেলুড় মঠের সূচনা: প্রাচীনকাল থেকে এই পূজা চললেও ১৯০১ সালে যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতার বেলুড় মঠে মহাসমারোহে কুমারী পূজা শুরু করেন। তিনি ৯ জন কুমারীকে পুজো করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ‘মাতৃভাব’ ও ‘সর্বজীবে শিবজ্ঞান’ দর্শনকে সমুন্নত রাখতেই বিবেকানন্দ এই প্রথার পুনর্জাগরণ ঘটান, যা আজ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়।
পাক করার কারণ ও কঠোর নিয়ম: কেন এত সতর্কতা?
কুমারী পূজায় দেবীর ভোগ বা অন্ন পাক (রান্না) করার পেছনে রয়েছে পরম ভক্তি ও শুদ্ধতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। একে কেবল সাধারণ রান্না বলা ভুল হবে, এটি স্বয়ং ঈশ্বরের জন্য তৈরি হওয়া এক মহাযজ্ঞ। এর মূল কারণগুলো হলো:
শতভাগ পবিত্রতা নিশ্চিতকরণ: কুমারী পূজায় যাকে পূজা করা হচ্ছে, তাকে কোনো মাটির প্রতিমা নয়, বরং সাক্ষাৎ ‘জীবন্ত ঈশ্বরী’ মনে করা হয়। তাই তার নিবেদিত ভোগ রান্নার সময় শারীরিক ও মানসিক শুদ্ধতা বাধ্যতামূলক। একটু অসাবধানতা বা অশুদ্ধতা পুরো পূজার আধ্যাত্মিক আবহকে নষ্ট করতে পারে।
উপবাস ও মন্ত্রোচ্চারণ: যিনি বা যারা এই ভোগ পাক করেন, তাদের সম্পূর্ণ উপোস (নির্জলা বা ফল আহার) থাকতে হয়। রান্নার সময় অবিরাম দেবীর নাম বা মন্ত্র জপ করতে হয়, যাতে রান্নাকারীর কোনো জাগতিক বা নেতিবাচক চিন্তা অন্ন স্পর্শ করতে না পারে।
বিশেষ উপাদানের ব্যবহার: এই রান্নায় সাধারণত কোনো কৃত্রিম রঙ, অতিরিক্ত মসলা বা পেঁয়াজ-রসুন (তামসিক খাবার) ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ ঘি, গঙ্গাজল এবং শুদ্ধ উপাদানে সাত্ত্বিক উপায়ে এই মহাপ্রসাদ তৈরি করা হয়, যা দেবীর শরীরে ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার করে।
কুমারী পূজার মূল বার্তাই হলো—জগতে যত নারী আছেন, তারা সবাই পরমেশ্বরীর একেকটি রূপ। এই বোধ থেকে প্রতিটি নারীকে শ্রদ্ধা করাই কুমারী পূজার প্রকৃত সার্থকতা।


