প্রতিষ্ঠার এক দশক পেরিয়ে গেলেও শিক্ষক সংকট কাটেনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) আইন বিভাগে। বর্তমানে প্রায় ২৮০ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান, পরীক্ষা, গবেষণা, একাডেমিক তদারকি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন মাত্র চারজন শিক্ষক। ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত কর্মভার সামলাতে গিয়ে চাপে রয়েছেন বিভাগের শিক্ষকরা।
জানা গেছে, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে একাডেমিক যাত্রা শুরু করা বিভাগটিতে বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাচ মিলিয়ে প্রায় ২৮০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এসব শিক্ষার্থীর পাঠদান পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন মোট আটজন শিক্ষক। তবে উচ্চশিক্ষায় চারজন জন ছুটিতে থাকায় কার্যত বিভাগটিতে রয়েছে মাত্র চারজন শিক্ষক।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:২০-এর মধ্যে রাখাকে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সে তুলনায় কুবির আইন বিভাগে ২৮০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৪ জন শিক্ষকে সেই অনুপাত গিয়ে দাঁড়ায় ১:৭০। অর্থাৎ একজন শিক্ষককে গড়ে ৭০ জন শিক্ষার্থীর একাডেমিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক সংকটের কারণে একজন শিক্ষককে গড়ে ৫ থেকে ৬টি পর্যন্ত কোর্স পড়াতে হচ্ছে। ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল প্রকাশ, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পরামর্শ, গবেষণা ও ফিল্ডওয়ার্কে তত্ত্বাবধান এবং প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে তাদের। এতে শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে বাড়তি কাজের চাপ।
চলতি বছরের ২৩ জুন সেশনজট কমানোর দাবিতে বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিভাগে তালা ঝুলিয়ে কর্মসূচি পালন করেন। পরে শিক্ষার্থীদের পক্ষে থেকে ছয়টি দাবি জানানো হলে, দাবি পূরণের আশ্বাস দেন বিভাগীয় প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) সাদিয়া তাবাসসুম, আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন এবং তৎকালীন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল।
সে অনুযায়ী একাডেমিক ক্যালেন্ডারে পরিমার্জন করে সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনমাফিক করা হয়েছেও বলে জানান শিক্ষার্থীরা। এবং যাবতীয় সংকট সমাধানে অতিদ্রুত শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান তারা।
এনিয়ে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসিন পাঠান সৈকত বলেন, 'কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় আইন বিভাগে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটি দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। একটি স্বতন্ত্র অনুষদ হওয়া সত্বেও আইন অনুষদ একটি অবহেলিত অনুষদ। বর্তমানে আইন বিভাগে ৭টি ব্যাচের একাডেমিক কার্যক্রম চলমান, অথচ এর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৪ জন।
তিনি আরও বলেন, ‘বিভাগে এখন পর্যন্ত কোনো প্রফেসর নেই, ৮ জন সহকারী অধ্যাপকের মধ্যে ৪ জন শিক্ষা ছুটিতে থাকায় শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হয়েছে। প্রত্যেক ব্যাচের প্রায় ৬০ শতাংশ কোর্স সম্পন্ন করতে হচ্ছে গেস্ট টিচারের মাধ্যমে। ফলে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সেশনজটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় বর্তমান প্রশাসনের কাছে শিক্ষার্থীদের দাবি দ্রুত প্রফেসরসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, নতুন ক্যাম্পাসে স্বতন্ত্র অনুষদ বিল্ডিং বরাদ্দ ও পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা প্রদান করে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকা।'
আইন বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী যোবায়ের আহমেদও বিভাগে সংকটের পাশাপাশি সিনিয়র শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে বলেন, 'আমাদের বিভাগে আটজন শিক্ষকের মধ্যে চারজন শিক্ষা ছুটিতে চলে গেছেন। ফলশ্রুতিতে সেমিস্টারে কোর্সগুলো শেষ করতে আন্তঃবিভাগ ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর হতে হচ্ছে। বিভাগ চালু হওয়ার দশ বছরেও বিভাগে একজন অধ্যাপক নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'অন্য বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগ থেকে শিক্ষকবৃন্দের ক্লাস নিতে আসার কারণে আমাদের ক্লাসরুটিনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি নমনীয় হয়ে ওনাদের সুযোগ করে দিতে হয়। আমাদের বিভাগের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটতো না। আমাদের দাবি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিভাগে অধ্যাপক অথবা সিনিয়র শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে প্রত্যেকটি ব্যাচের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া।'
এ বিষয়ে আইন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) সাদিয়া তাবাসসুম বলেন, ‘শিক্ষক সংকটের কারণে আমাদের প্রত্যেক শিক্ষকই ৬টা করে কোর্স নিচ্ছেন। ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল প্রকাশ, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পরামর্শ, গবেষণা ও ফিল্ডওয়ার্কে তত্ত্বাবধানও একজন শিক্ষকের কাজ। শিক্ষক সংকটের পরও আমাদের কার্যক্রম চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষক সংকটের বিষয়টি বর্তমান প্রশানকে জানানো হয়েছে। আসা করছি দ্রুত এর সমাধান হবে।’


