মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্বের এক চতুর্থাংশ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের প্রায় দুই’শ কোটি মানুষের ওপর, যা বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই এই অঞ্চলটি মূলত উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। তবে উপসাগরীয় জ্বালানি সরবরাহ এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর নির্ভরতার ধরন ও মাত্রায় যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। এখন সরবরাহ রুটগুলো একে একে সংকুচিত হয়ে আসায় এই দেশগুলোর প্রতিটিই দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্তৃত এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব অনুভব করছে।
দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি নির্ভরতা
ভারত তার ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানি করে এবং দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ক্রুড বা তেল আমদানিকারক। যুদ্ধের আগে ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় উৎপাদকরা ছিল এর অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। অন্যদিকে কাতার ছিল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রধান উৎস। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রতিবেশীদের তুলনায় ভারতের সরবরাহ নেটওয়ার্কটি কিছুটা বৈচিত্র্যময়, কারণ দেশটি রাশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশ থেকেও তেল আমদানি করে থাকে।
পাকিস্তানও আমদানিকৃত জ্বালানি, বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত ঐতিহ্যগতভাবে এর গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী দেশ, আর কাতার এর প্রধান দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহকারী। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করলেও স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে চাহিদা মেটাতে না পারায় ক্রমবর্ধমানভাবে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভর করছে। কাতার এর অন্যতম প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী এবং দেশটি পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যও আমদানি করে।
নেপালের সাথে উপসাগরীয় দেশগুলোর কোনো প্রত্যক্ষ ক্রুড বা এলএনজি আমদানির সম্পর্ক নেই। স্থলবেষ্টিত এই দেশটির পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন এবং এলপিজিসহ প্রায় সমস্ত পেট্রোলিয়াম পণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রভাব নেপালের ওপর পরোক্ষভাবে পড়ে—ভারতে জ্বালানি সংকট বা দাম বাড়লে তা দ্রুত নেপালের জ্বালানি বাজারেও এসে প্রভাব ফেলে।
পরিমাণগত দিক থেকে ভারতের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি, আর পাকিস্তান ও কিছু সংকটপূর্ণ জ্বালানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিকল্প বেশ সীমিত। নেপালের নির্ভরতা এক ধাপ দূরে হলেও ভারতের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটলে তা খুব দ্রুত নেপালের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বরাবরের মতোই এই সংকটের বড় ধাক্কা পোহাতে হচ্ছে সমাজের দরিদ্র ও আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষগুলোকে।
‘আর্থিকভাবে আমি সম্পূর্ণ অসহায় বোধ করছি’
সাজিদা জিবরান পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর করাচির একজন ৪৫ বছর বয়সি গৃহকর্মী। তিনি একটি অভিজাত এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেন। তার স্বামী স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে আর কাজ করতে পারেন না এবং তার তিন সন্তান মধ্য ও উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। সাজিদা জানান, গত বছরের শেষে তার বাসার ভাড়া যা ১৫,০০০ পাকিস্তানি রুপি ($৫৪) ছিল, গত মাসে তা বেড়ে ২৫,০০০ রুপিতে ($৯০) দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধের আগে সবাই খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারত। আমি মাংস, মুরগি কিনতে পারতাম, কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে শাকসবজি পর্যন্ত এত দামি হয়ে গেছে যে তা কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাজিদা আরও বলেন, বিদ্যুতের দাম অনেক বেড়ে গেছে, আমাদের বিল আগে যেখানে প্রায় ১,৫০০ রুপি ($৫.৪) আসত, এখন তা ৫,০০০ রুপি ($১৮) থেকে শুরু হয়। গ্যাসের বিলও খুব বেশি আসে এবং সর্বনিম্ন ২,০০০ রুপি ($৭) হয়।
পাকিস্তানে প্রাকৃতিক গ্যাস স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হতো বিধায় এর বিল ঐতিহাসিকভাবে খুবই কম ছিল, কিন্তু এখন দেশের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় পাকিস্তান মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে।
সাজিদাকে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটি নিতে হয়েছে তার সন্তানদের স্কুলের ফি দেওয়া বন্ধ করে দিয়ে: হয় তাদের পড়াশোনা করাবেন, না হয় খাওয়াবেন। তিনি বলেন, আমি সবসময় আশা করতাম আমার সন্তানরা পড়াশোনা করবে, ভালো শিক্ষা পাবে এবং ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পাবে। আমি কোনোমতে পেটে-ভাতে খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছি। এর বাইরে তাদের জন্য আমার করার খুব বেশি কিছু নেই।
তিনি আরও বলেন, যখন দেখি আমার সন্তানরা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পেরে ঘরে বসে আছে, তখন দিন-রাত আমার চোখে ঘুম আসে না। আর্থিকভাবে আমি সম্পূর্ণ অসহায় বোধ করছি।
‘মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবকিছুই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে’
বালেন্দ্র সিং ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির একজন নিরাপত্তা প্রহরী। ৬৭ বছর বয়সি এই মানুষটি নয়াদিল্লির সংলগ্ন শহর নয়ডার একটি ছোট ঘরে পরিবারের ছয় সদস্যকে নিয়ে থাকেন। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শহরের ব্যয়বহুল জীবনযাত্রার খরচ কমাতে তিনি তার পরিবারের কিছু সদস্যকে লখনউয়ের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হন। উত্তর প্রদেশ রাজ্যের রাজধানী হলো লখনউ, আর নয়ডাও এই রাজ্যেরই অন্তর্ভুক্ত।
সিং বলেন, আজকের দিনে একটি বড় শহরে এতগুলো মানুষের মুখের খাবার জোগানোর সামর্থ্য আমার নেই। মূল্যস্ফীতি আমাদের কোণঠাসা করে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবকিছুই আমাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে—আর আমাদের বেতন একই রয়ে গেছে। নয়ডার মতো একটি ব্যয়বহুল শহরে কী খাচ্ছেন তার চেয়ে বড় কথা হলো কতজন মানুষ খাচ্ছেন, সেটাই এখন মূল বিষয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বালেন্দ্র সিংয়ের নিজস্ব কোনো গাড়ি নেই, তবে কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য তাকে যে রিকশায় চড়তে হয়, সেখানেও জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব তিনি হাড়ে হাড়ে টের পান। তিনি বলেন, রিকশার ভাড়ার ভিত্তি মূল্য বেড়ে গেছে। এই বৃদ্ধি মাত্র পাঁচ রুপি হলেও আমাদের জন্য এটি অনেক বড় ব্যাপার—কারণ মাসে কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য এটি প্রায় ৩০০ রুপির ($৩) মতো অতিরিক্ত খরচ। এরপর তিনি এবং তার পরিবারের বাকি সদস্যরা কীভাবে জীবনযাত্রার বর্ধিত ব্যয়ের সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন তা বর্ণনা করে বলেন, আমরা হয়তো সপ্তাহে তিনবার মাছ খাওয়ার বদলে এখন সপ্তাহে একবার খাই এবং তরকারির ঝোলে পেঁয়াজ দিই কম।
সিং জানান, যুদ্ধের শুরুতে যখন এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল, তখন তিনি এবং তার প্রতিবেশীরা পুরোনো কাঠভিত্তিক জ্বালানি ব্যবহার শুরু করেছিলেন। তিনি জানেন যে এই ধোঁয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, কিন্তু তাদের আর কোনো উপায় ছিল না—আর এই সবই এমন এক যুদ্ধের কারণে, যার সাথে তিনি বা তার দেশের কোনো সম্পর্ক নেই।
‘আমার সন্তানরা তো ইরানে হামলা করেনি। আমার সন্তানরা এই যুদ্ধকে সমর্থনও করে না। অথচ দূর পরবাসের রাজনীতির বোঝা টানতে আমাদের এখানে ফেলে রাখা হয়েছে। আমি সরকারের কাছে আবেদন জানাতে চাই, যেন আমাদের এই মূল্যবৃদ্ধির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
পরিবারের ওপর ছড়িয়ে পড়া চাপের ঢেউ
আসমা বেগম একজন গৃহবধূ, দুই সন্তানের জননী এবং বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার একজন গৃহকর্মী। তিনি একটি পরিবারে থালাবাসাসন ধোয়া ও অন্যান্য গৃহস্থালির কাজ করে মাসে প্রায় ৫,০০০ টাকা ($৪১) আয় করেন। তিনি আরও বেশি আয় করতে চান, কিন্তু মনে হচ্ছে কাজের সুযোগ আগের চেয়ে কমে গেছে। তিনি বলেন, ধনী লোকেরাও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে আছেন। তারা গৃহকর্মী না রেখেই নিজেরাই ঘরের কাজ সামলানোর চেষ্টা করছেন।
আসমার কাছে এটি ফুটিয়ে তোলে যে কীভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ এক পরিবার থেকে অন্য পরিবারে ছড়িয়ে পড়ছে: যেসব পরিবার বাড়তি খরচের মুখে পড়েছে তারা গৃহকর্মী রাখার মতো আনুষঙ্গিক খরচ কমিয়ে দিচ্ছে, যা ফলস্বরূপ তার মতো নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের আয়ের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। তিনি যোগ করেন, সবার একই সমস্যা। আমরা সবাই কাজ করেই বেঁচে আছি।
আসমা জানান, এই চাপ শুধু তার নিজের পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়। তার বাবা ও ভাই একই এলাকার নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, আর তার মা ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও একটি মেসে রান্নার কাজ করেন। তারাও একইভাবে সংগ্রাম করছেন।
‘সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে’
গ্যানু বাসেন্ট নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুর গৌশালা এলাকায় কুলির কাজ করেন। ৫৮ বছর বয়সি এই ব্যক্তি ১৫ বছরের এক কন্যার জনক এবং তার বৃদ্ধ বাবা ও ভাইবোনেরাও তার ওপর নির্ভরশীল। গ্যানু কখনো স্কুলে যাননি এবং কাজের সন্ধানে তাকে কাঠমাণ্ডুতে চলে আসতে হয়েছিল। তিনি বলেন, আমরা আগে চাষবাস করতাম, কিন্তু বাদরগুলো আমাদের কৃষিকাজ করতে দেয় না। তাছাড়া গ্রামের একটি স্থানীয় সমবায় সমিতি আমার বাবার সারা জীবনের জমানো সঞ্চয় আত্মসাৎ করেছে।
তিনি আরও বলেন, আজকাল আমি মূলত কুলির কাজ করি। আমি সব ধরনের বোঝা টানি এবং আজকাল আমি মূলত এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার বহন করি। তবে তার কাজ সবসময় থাকে না বললেই চলে। আমি দিনে প্রায় ৫০০ টাকা ($৪) আয় করি এবং এর কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ নেই। যখন কাজ কম থাকে, তখন আমি কষ্টে ২০০-৩০০ টাকা কামাই।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় তিনি নিজে রান্না করার চেয়ে বাজেট-বান্ধব রেস্তোরাঁতেই খান। তিনি বলেন, আমি আমার পরিবারকে খুব বেশি টাকা পাঠাতে পারি না। আমার সৌভাগ্য যে একটি অলাভজনক সংস্থা আমার মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করছে। আমার বাবা তার বয়স্ক ভাতার টাকা দিয়ে নিজের খরচ চালান। যা সঞ্চয় করতে পারি তা দিয়ে আমি কাপড় কিনি, মেয়ের জন্য উপহার কিনি এবং সাধ্যমতো পরিবারকে সাহায্য করি।


