...|...|...

বিশ্ব

ইরানের ড্রোন ঠেকাতে লেজার অস্ত্র নামাল যুক্তরাষ্ট্র

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৯:১৩ | আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১০:৩২
Shares
ইরানের ড্রোন ঠেকাতে লেজার অস্ত্র নামাল যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: সংগৃহীত

ইরানের ড্রোন হুমকি মোকাবিলায় অত্যাধুনিক লেজার প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুদ্ধক্ষেত্রের উপযোগী এসব লেজার অস্ত্র তৈরিতে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক কম খরচে ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল ধ্বংসে সক্ষম এই প্রযুক্তি।

সম্প্রতি ইরানের আকাশে দেখা যাওয়া কিছু রহস্যময় আলোকচ্ছটা নিয়ে জল্পনা তৈরি হলেও, বাস্তবে এগুলো কোনো আলোকসজ্জা নয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন ধ্বংস করছে তাদের বাহিনী।

প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলা এই লেজার অস্ত্র উন্নয়ন প্রকল্প সক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দাবি সংশ্লিষ্টদের। ডিরেক্টেড এনার্জি কনসালট্যান্টসের প্রধান মার্ক নাইস জানান, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্টভাবে ড্রোন শনাক্ত করে তার ঠিক যে অংশে আঘাত করা প্রয়োজন, সেখানেই লেজার রশ্মি কেন্দ্রীভূত করা সম্ভব- ফলে সেন্সর নষ্ট করা কিংবা পুরো ড্রোনটিই ধ্বংস করে দেওয়া যায়।

লেজার প্রযুক্তিতে ব্যাটারি বা জেনারেটর থেকে পাওয়া শক্তিকে আলোককণা বা ফোটনে রূপান্তরিত করা হয়, এরপর সেগুলোকে একটি তীব্র রশ্মিতে কেন্দ্রীভূত করা হয়। খালি চোখে সাধারণত অদৃশ্য এই রশ্মি মূলত ইনফ্রারেড আলোর মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব। নির্দিষ্ট সময় ধরে লক্ষ্যবস্তুর ওপর এই রশ্মি স্থির রাখলে তাপমাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বস্তুটি গলে যেতে পারে বা বিস্ফোরিত হতে পারে। লেজার যুদ্ধবিষয়ক লেখক জ্যারেড কেলারের ভাষ্য অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড ধরে রশ্মিটি স্থির রাখাই যথেষ্ট।

চমকপ্রদ বিষয় হলো, এসব অত্যাধুনিক লেজার অস্ত্রের কিছু ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে পুনর্বিন্যাস করা এক্সবক্স গেম কনসোলের কন্ট্রোলার দিয়ে। কেলারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গেমিং শিল্প বছরের পর বছর গবেষণা করে সবচেয়ে কার্যকর কন্ট্রোলার ডিজাইন তৈরি করেছে, তাই সামরিক বাহিনীও নতুন করে কন্ট্রোল সিস্টেম তৈরির পরিবর্তে সেই প্রযুক্তিই ব্যবহার করছে।

মেক্সিকোর মাদক চক্রের ড্রোন কার্যক্রমও এই প্রযুক্তির অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে মাদক কারবারিদের পাঠানো ড্রোন প্রতিহত করতে জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স সাউদার্ন বর্ডার এই প্রযুক্তি পরীক্ষা করছে, এবং এ পর্যন্ত অন্তত ১১টি ড্রোন লেজার দিয়ে ভূপাতিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ সীমান্তে এখন পর্যন্ত মানুষের বিরুদ্ধে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো প্রমাণ নেই।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে যুদ্ধকৌশল ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে লেজার প্রযুক্তি। চলমান যন্ত্রাংশ কম থাকায় সলিড-স্টেট লেজার একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের, যার ফলে ভবিষ্যতে বিপুল গোলাবারুদ মজুতের প্রয়োজনও কমে আসতে পারে।

তবে এখনই সেনাদের কাঁধে বহনযোগ্য লেজার অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নামার সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা ব্যবস্থাগুলো আকারে বড় ও ভারী হওয়ায় সেগুলো মূলত যুদ্ধজাহাজে স্থাপন করা হয়। ‘হাই-এনার্জি লেজার উইথ ইন্টিগ্রেটেড অপটিক্যাল ড্যাজলার অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স’ নামের এই ব্যবস্থাগুলোতে ৬০ কিলোওয়াট ক্ষমতার উচ্চশক্তির লেজার ব্যবহৃত হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এদিকে বোয়িং সম্প্রতি একটি কমপ্যাক্ট লেজার অস্ত্র ব্যবস্থা উন্মোচন করেছে, যা প্রায় ৫৯০ কেজি ওজনের ‘গ্রুপ-৩’ শ্রেণির ড্রোন পর্যন্ত ধ্বংস করতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে পরিষ্কার আকাশ ছাড়া এই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে কাজ করে না এবং একসঙ্গে বহু ড্রোনের সমন্বিত হামলা মোকাবিলায়ও এর সক্ষমতা সীমিত।

লেজার প্রযুক্তির পরবর্তী গন্তব্য হতে পারে মহাকাশ। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স সম্প্রতি কক্ষপথে সক্রিয় অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, যদিও তাতে লেজার প্রযুক্তি রয়েছে কি না তা নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি মার্ক নাইস। তবে ভবিষ্যতে মহাকাশে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত জুনে নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে অনুষ্ঠিত এক লেজার অস্ত্র প্রদর্শনীতে অংশ নেন মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ। মাত্র কয়েক মিনিটের প্রশিক্ষণের পরই তিনি একটি কন্ট্রোলার ব্যবহার করে সফলভাবে একটি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হন বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পরীক্ষাগার থেকে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে লেজার প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান গতি রোনাল্ড রিগ্যানের সময়কার ‘স্টার ওয়ার্স’ কর্মসূচির পর আর দেখা যায়নি।