২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত চট্টগ্রামের রাজপথ ছিল অদ্ভুত এক বৈপরীত্যের সাক্ষী- একদিকে সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা, অন্যদিকে সংঘাত, আতঙ্ক ও চরম অনিশ্চয়তা। পেশাগত দায়িত্বে বহু আন্দোলন কভার করলেও জুলাই-আগস্টের সেই দিনগুলোর অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষের উপস্থিতি ও সশ্রদ্ধ অংশগ্রহণে স্পষ্ট ছিল, তারা স্রেফ আন্দোলন করছে না; বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ নতুন করে লিখতে মাঠে নেমেছে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন সংঘাত ও প্রাণহানির পর দ্রুত নতুন মোড় নেয়। আগস্টের সূচনায় চট্টগ্রামের রাজপথে শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ান শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী ও রিকশাচালকসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। রূপ নেয় এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের। আন্দোলনকারীদের মূল সুর ছিল জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।
৪ আগস্ট: রাজপথে সংঘর্ষ ও সেনা টহলের চিত্র
৪ আগস্ট নিউমার্কেট, কাজীর দেউড়ি, ওয়াসা মোড়সহ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তীব্র সংঘর্ষে স্থবির ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে পুরো শহর। আন্দোলনকারী ও পথচারীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়লে দেখা যায় ভিন্ন দৃশ্যপট।
দামপাড়া এলাকায় অবস্থানরত সেনাবাহিনীর টহলদলের কাছে সহায়তা চান আন্দোলনকারীরা, এবং সেনাসদস্যরা দ্রুত তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাসদস্যরা কাজীর দেউড়ি, লালখান বাজার, খুলশী, জিইসি মোড় ও মেহেদীবাগে অবস্থান নেন। এতে ওয়াসা মোড়ে আটকে পড়া হাজার হাজার মানুষ নিরাপত্তার আশ্বাস পান এবং গভীর রাতে পরিস্থিতি শান্ত হতে শুরু করে।
শাহ আমানত মার্কেটে উদ্ধার অভিযান
একই দিন শাহ আমানত মার্কেট এলাকায় চরম উত্তেজনার মধ্যে প্রায় ২০০ জন আন্দোলনকারী আটকা পড়েন। তাদের প্রাণহানির আশঙ্কায় সেনাবাহিনী একটি বিশেষ দল নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং প্রতিকূলতার মধ্যে তাদের নিরাপদে বের করে আনে। তৎকালীন ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মুহাম্মদ মাইনুর রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় রাজনীতি বা পরিচয় নির্বিশেষে মানুষের জীবন বাঁচানোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
৫ আগস্ট-পরবর্তী বাস্তবতা ও আইনশৃঙ্খলা পুনর্গঠন
৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামের পরিস্থিতি আবারও মোড় নেয়। চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সরকারি সম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়ে, অনেক পুলিশ সদস্যও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন। সেনা টহল দল কোতোয়ালি থানাসহ অন্যান্য স্থানে আটকে পড়া পুলিশ সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেয় এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা নিশ্চিত করে।
পরবর্তী সময়ে দেশের ৫৮টি জেলায় ২০৬টি সেনাক্যাম্প স্থাপন এবং ৪১৭টি থানায় সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়। এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামেও স্থবির হয়ে পড়া থানাগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালু হতে শুরু করে।
সাংবাদিকের দৃষ্টিতে শেষ কথা
জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্মৃতি নয়; বরং এটি ছিল জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং সংকটে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার বড় এক পরীক্ষা। দেশের পরিবর্তন কেবল রাজপথের শক্তিতে আসে না- একে টেকসই করতে হলে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং নাগরিকদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
২০২৪ সালের সেই উত্তাল দিনগুলো চট্টগ্রামবাসীর কাছে একদিকে জাতির জাগরণ, অন্যদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রের এক ঐতিহাসিক পরীক্ষার স্মারক হয়ে থাকবে।

