মৌলভীবাজার সদর উপজেলার অলহা শ্রী শ্রী দুর্গাবাড়ি। লোকমুখে প্রচলিত, এখানে মা দুর্গা ২০০০ সাল থেকে জাগ্রত। বাবা-মা, দাদা-দাদির মুখে এই গল্প শুনে বড় হওয়া শিশুদের কাছে মন্দিরটি শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, আবেগ ও ভরসার জায়গা। সেই বিশ্বাসের টানেই প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মন্দির চত্বরে ছুটে আসে শিশুরা।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা মা দুর্গার কাছে মানত করতে ছুটে আসছে পূজামণ্ডপে। কেউ মা-বাবার সাথে মন্দিরে এসে প্রার্থনা করছে, কেউবা খালি হাতে দুই হাত জোড় করে চোখ বন্ধ করে মনে মনে নিজের চাওয়া জানাচ্ছে। তাদের কাছে এটাই মানত, এটাই মায়ের প্রতি বিশ্বাস।
স্থানীয় প্রবীণ পুরোহিত জানান, এই মন্দিরের মহিমা আলাদা। এখানে যা চাওয়া হয়, মা দুর্গা তা পূর্ণ করেন-এমন বিশ্বাস দুই যুগ ধরে চলে আসছে। বড়রা যেমন মানত করেন, ছোটরাও তেমনি নিষ্পাপ মনে মায়ের কাছে আকুতি জানায়। কারও চাওয়া পরীক্ষায় ভালো ফল, কারও প্রার্থনা বাবার অসুখ সেরে যাক।
কথা হয় ৯ বছরের রনি দাসের সাথে। সে বলে, মা দুর্গার কাছে বলেছি যেন আমার বাবা বিদেশ থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি আসে। মা ঠিক শুনবে। পাশে দাঁড়ানো ১০ বছরের অর্পণ দেব জানায়, সে মানত করেছে, এবার বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হতে পারলে মাকে একটি লাল শাড়ি উপহার দেবে।
শিশুদের এই প্রার্থনা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিশ্বাসের সঞ্চার। মা-বাবা ও পরিবারের বড়দের মুখে শোনা গল্পই শিশুদের মনে গেঁথে দিয়েছে মন্দিরটির প্রতি গভীর আস্থা। মা দুর্গা জাগ্রত, তার কাছে চাইলে মনোবাসনা পূরণ হয়-এই বিশ্বাসই এখন তাদের মুখে মুখে।
দুর্গাবাড়ির সেবক নিতাই দেবনাথ বলেন, দুর্গাপূজার সময় তো বটেই, সারা বছরই এই মন্দিরে ভক্তদের ভিড় লেগে থাকে। তবে শিশুদের এই নিষ্পাপ প্রার্থনা মন্দিরের পরিবেশকে আরও পবিত্র করে তোলে। তিনি আরও জানান, অলহা দুর্গাবাড়ি মন্দিরে ২০০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা জাগ্রত মা নিজে।
শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষই নন, অনেক মুসলিম পরিবারের শিশু ও তরুণেরাও এই মন্দিরে আসেন। ধর্মীয় ভিন্নতা পেরিয়ে মানুষের এই উপস্থিতি মৌলভীবাজারের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
শিশুদের আবেগ আর বিশ্বাস যেন মনে করিয়ে দেয়, ভক্তির কোনো বয়স নেই। মায়ের কাছে তাদের চাওয়া ছোট ছোট, কিন্তু সেই চাওয়ার সাথে জড়িয়ে আছে ভালোবাসা, আশা আর নির্ভরতা। অলহা দুর্গাবাড়ি তাই শুধু একটি মন্দির নয়, মৌলভীবাজারের অনেক শিশুর আবেগ ও বিশ্বাসের ঠিকানা।


