...|...|...

অন্যান্য

‘জলপরী’ আসলে কী, কোথা থেকে এলো এই মিথ?

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১১:৩০
Shares
‘জলপরী’ আসলে কী, কোথা থেকে এলো এই মিথ?

হাজার বছর ধরে জলপরী ঘিরে নানা পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। প্রতীকী ছবি

নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার আলালপুর গ্রামের একটি পুকুরে ‘জলপরী’ দেখা গেছে-এমন গুজবে কয়েক দিন ধরে সেখানে মানুষের ভিড় জমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে শুরু হয় আলোচনার ঝড়। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে ছুটে আসেন কথিত জলপরী দেখতে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের উদ্যোগে পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরার পর জানা যায়, রহস্যময় সেই ‘জলপরী’ আসলে কিছুই নয়, পানিতে চলাচল করা মাছের ঝাঁক।

পুকুরটি ব্যক্তিমালিকানাধীন। এর মালিক কবির আহমেদ ভূঁইয়া। তিনি ঢাকায় থাকেন এবং পুকুরটিতে রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া ও সিলভার কার্পসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করেন। পুকুরে অস্বাভাবিক কিছু দেখা গেছে-এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি গ্রামে গিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা চান।

মনোহরদীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, চার থেকে পাঁচ দিন আগে স্থানীয় এক কনটেন্ট নির্মাতা ফেসবুকে পুকুরে কিছু একটা সাঁতার কাটার একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে পানির প্রায় ওপরের দিকে কালো অবয়বের কিছু একটা চলাচল করতে দেখা যায়। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেটিকে ‘জলপরী’ বলে প্রচার শুরু হয়।

গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ পুকুরটির কাছে ভিড় করতে থাকেন। একপর্যায়ে সেখানে শত শত মানুষের সমাগম হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। স্থানীয় কিছু মানুষ আবার পুকুর ঘিরে পূজা ও অর্চনা শুরু করেন।

পরে পুলিশ ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে পুরো পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা হয়। এতে কথিত জলপরীর অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, পুকুরে মাছ ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যায়নি। মাছের ঝাঁক একসঙ্গে চলাচল করার সময় পানির ওপর থেকে বা পাশ থেকে সেটিকে বড় কোনো প্রাণীর নড়াচড়া বলে মনে হতে পারে।

তিনি বলেন, ওই মাছের ঝাঁকের একসঙ্গে চলাচল একদিনই দেখা গিয়েছিল। সেটির ভিডিও করে কেউ কেউ কৃত্রিম প্রযুক্তির সহায়তায় গুজব ছড়িয়েছেন বলেও জানান ইউএনও।

গুজব যাতে আর ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য পুলিশকে নিয়মিত পুকুরটির আশপাশে নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শুধু ভিউ পাওয়ার আশায় এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে না দিতে কনটেন্ট নির্মাতাদের সতর্ক করা হয়েছে। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে একজন কনটেন্ট নির্মাতার কাছ থেকে মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে।

জলপরীর মিথের শুরু কোথায়?

নরসিংদীর আলালপুরের পুকুর ঘিরে ছড়িয়ে পড়া ‘জলপরী’র গল্প নতুন কিছু নয়। পৃথিবীর নানা সংস্কৃতিতে হাজার হাজার বছর ধরে জলপরী বা মৎস্যকন্যাকে ঘিরে নানা ধরনের পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। কোনো সংস্কৃতিতে জলপরীকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে, আবার কোথাও তাকে অমঙ্গল, বিপদ কিংবা দুর্যোগের বার্তাবাহক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।

ইংরেজি ‘মারমেইড’ শব্দটি সমুদ্র ও তরুণী বোঝানো দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। প্রচলিত কল্পচিত্রে মারমেইডের শরীরের ওপরের অংশ মানুষের মতো, আর নিচের অংশ মাছের লেজের মতো। পুরুষ জলজ চরিত্রকে সাধারণত ‘মারম্যান’ বলা হয়।

বিভিন্ন লোককথায় জলপরীদের দীর্ঘ জীবন, গান গাওয়ার ক্ষমতা কিংবা ভবিষ্যৎ দেখার মতো অলৌকিক শক্তির অধিকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার বহু নাবিকের গল্পে তাদের ঝড়, জাহাজডুবি কিংবা আসন্ন বিপদের পূর্বাভাস হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।

তবে জলপরীর ধারণার নির্দিষ্ট উৎপত্তি কোথায় বা ঠিক কোন সময়ে এর জন্ম, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিভিন্ন সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শন ও লোককথায় জলজ মানবসদৃশ চরিত্রের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

রয়েল মিউজিয়ামস গ্রিনউইচের তথ্য অনুযায়ী, মেসোপটেমীয় সভ্যতায় পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এক পুরুষ মৎস্যদেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার খ্রিস্টপূর্ব প্রায় এক হাজার বছর আগে সিরিয়ায় আতারগাতিস নামের এক দেবীকে ঘিরেও জলপরীর মতো একটি কাহিনী প্রচলিত ছিল।

সময়ের সাথে সাথে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলপরীর কাহিনী ভিন্ন ভিন্ন নাম ও রূপে ছড়িয়ে পড়ে। আফ্রিকায় ‘মামি ওয়াটা’, স্লাভিক সংস্কৃতিতে ‘রুসালকি’, আয়ারল্যান্ডে ‘মেরোজ’ এবং স্কটল্যান্ডে ‘সেলকি’ নামে জলজ অতিপ্রাকৃত চরিত্রের গল্প রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও ‘সুবর্ণমচ্ছা’ নামে জলপরীর একটি কাহিনী প্রচলিত।

গ্রিক পুরাণের ‘সাইরেন’ চরিত্রের সাথেও পরবর্তী সময়ে মৎস্যকন্যার ধারণা যুক্ত হয়েছে। হোমারের ‘ওডিসি’তে সাইরেনদের নাবিকদের প্রলুব্ধ করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার গল্প রয়েছে। তবে প্রাচীন বর্ণনায় সাইরেনদের শরীর ছিল পাখির মতো। পরে শিল্প ও সাহিত্যে তাদের মাছের লেজযুক্ত নারীরূপে উপস্থাপন করা শুরু হয়।

রূপকথা থেকে পর্দায় জলপরী

জলপরীর কাহিনী শুধু লোককথা কিংবা পৌরাণিক গল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সাহিত্য, নাটক, অপেরা ও চলচ্চিত্রেও এই চরিত্র বারবার ফিরে এসেছে।

ডেনিশ লেখক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেনের ‘দ্য লিটল মারমেইড’ রূপকথা ১৮৩৭ সালে প্রকাশের পর জলপরীর গল্প বিশ্বজুড়ে নতুন করে জনপ্রিয়তা পায়। পরে এটি থিয়েটার ও অপেরাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়। ১৯৮৯ সালে ডিজনির অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘দ্য লিটল মারমেইড’ মুক্তির পর চরিত্রটি বিশ্বজুড়ে আরও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

আর নরসিংদীর আলালপুরে সাম্প্রতিক ‘জলপরী’ কাণ্ডের শেষটাও হলো বাস্তবতার কাছে কল্পকাহিনীর পরাজয়। যে রহস্য দেখতে মানুষের ঢল নেমেছিল, পুকুরে জাল ফেলার পর তার সমাধান মিলেছে মাছের ঝাঁকেই।