পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে ২১ বছর আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন বাগেরহাটের রতন মৃধা। কিন্তু প্রায় ১০ বছর আগে হঠাৎ করেই পরিবারের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার সব যোগাযোগ। একসময় স্বজনরা ধরে নিয়েছিলেন, হয়তো আর বেঁচে নেই তিনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অনিশ্চয়তার পর অবশেষে জানা গেছে, রতন জীবিত আছেন। তবে তিনি মালয়েশিয়ার একটি কারাগারে বন্দি।
এই খবর যেমন পরিবারকে আশার আলো দেখিয়েছে, তেমনি বাড়িয়েছে নতুন উদ্বেগ। শেষ বয়সে বৃদ্ধা মায়ের এখন একটাই আকুতি—সরকার যেন তার ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো মায়ের বুকে ফিরিয়ে দেয়।
বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার মঘিয়া ইউনিয়নের আন্ধারমানিক গ্রামের বাসিন্দা রতন মৃধা। সংসারের অভাব-অনটন দূর করে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে ২১ বছর আগে বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। বিদেশে যাওয়ার পর নিয়মিত পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং পরিবারের জন্য অর্থ পাঠাতেন। কিন্তু প্রায় ১০ বছর আগে হঠাৎ করেই সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের মাধ্যমে বহু খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
ছেলের অপেক্ষা করতে করতেই মৃত্যুবরণ করেন বাবা নারায়ণ চন্দ্র মৃধা। আর বৃদ্ধা মা পুষ্প মৃধা প্রতিটি দিন কাটিয়েছেন একটাই আশায়—হয়তো কোনো একদিন ফিরে আসবে তার সন্তান। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেখে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, রতন মৃধা জীবিত আছেন এবং মালয়েশিয়ার একটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান হলেও এই খবর পরিবারকে একই সাথে আনন্দ ও বেদনায় ভাসিয়েছে।
পুষ্প মৃধা (মা) বলেন,আমি শুধু একবার আমার ছেলেকে দেখতে চাই। সরকারের কাছে আমার আকুতি, আমার ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে এনে আমার বুকে ফিরিয়ে দিন।
ছেলের জীবিত থাকার খবর পেয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে পরিবার। কিন্তু সেই স্বপ্নের সাথে জড়িয়ে আছে দুশ্চিন্তাও। কেন তিনি কারাগারে, কবে মুক্তি পাবেন কিংবা আদৌ দেশে ফিরতে পারবেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।
রতনের এই খবর নাড়া দিয়েছে পুরো আন্ধারমানিক গ্রামকেও। এলাকাবাসীর ভাষ্য, পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বিদেশে যাওয়া একজন মানুষ বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি থাকবেন—এটা তারা কখনো কল্পনাও করেননি।
প্রতিবেশী রমেশ চন্দ্র মৃধা বলেন, রতন খুবই পরিশ্রমী ছেলে ছিল। পরিবারের জন্য বিদেশে গিয়েছিল। অনেক বছর ধরে তার কোনো খবর ছিল না। এখন জানতে পেরেছি সে বেঁচে আছে, কিন্তু কারাগারে। আমরা চাই সরকার দ্রুত তাকে দেশে ফিরিয়ে আনুক।
স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর শেখ বলেন, বৃদ্ধা মা প্রতিদিন ছেলের অপেক্ষা করেন। একজন মায়ের এই কষ্ট আমরা কাছ থেকে দেখেছি। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিলে হয়তো তিনি জীবনের শেষ সময়ে ছেলেকে ফিরে পাবেন।
এদিকে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করা হবে। সব ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রতন মৃধাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কচুয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল কুমার দাস বলেন,রতন মৃধার বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক। প্রায় এক দশক ধরে তার পরিবার কোনো খোঁজ পায়নি। এখন তিনি জীবিত আছেন, কিন্তু মালয়েশিয়ার কারাগারে বন্দি—এটি পরিবারের জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনি উদ্বেগেরও। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাই, দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে তার আইনি অবস্থার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে তিনি দ্রুত দেশে ফিরে পরিবারের কাছে আসতে পারেন।
কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী হাসান বলেন, পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করব। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
২১ বছর আগে পরিবারের স্বপ্ন পূরণে দেশ ছেড়েছিলেন রতন মৃধা। আর গত এক দশক ধরে তার অপেক্ষায় দিন গুনছেন বৃদ্ধা মা। এখন তার একটাই প্রার্থনা— জীবনের শেষ সময়ে যেন অন্তত একবার ছেলেকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরতে পারেন। সেই অপেক্ষায় শুধু একটি পরিবার নয়, তাকিয়ে আছে পুরো গ্রাম।


