খাবারের পরিমাণ নিয়ে আমরা প্রায়ই একটি ভুল করি প্লেটে যতটুকু খাবার নিই, সেটাকেই খাবারের ‘এক সার্ভিং’ ধরে নিই। অথচ পুষ্টিবিজ্ঞানে সার্ভিং সাইজ এবং পোরশন সাইজ একই বিষয় নয়। এই ছোট পার্থক্যটি না জানার কারণে অজান্তেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি, চিনি, লবণ ও চর্বি গ্রহণ করা হতে পারে।
বাংলাদেশে ভাত, ডাল, মাছ, মাংস, দুধ, ফল কিংবা নাশতা প্রতিদিনের খাবারে পরিমাণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে খাবারের পরিমাণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার।
সার্ভিং সাইজ কী?
সার্ভিং সাইজ হলো নির্দিষ্ট কোনো খাবারের একটি পরিমাণ, যা সাধারণত পুষ্টিবিষয়ক তথ্য দেওয়ার জন্য নির্ধারণ করা হয়। প্যাকেটজাত খাবারের লেবেলে যে পরিমাণকে এক সার্ভিং হিসেবে উল্লেখ করা থাকে, সেটিই সার্ভিং সাইজ।
যেমন, কোনো খাবারের লেবেলে যদি এক সার্ভিং ২৮ গ্রাম লেখা থাকে, তাহলে সেই ২৮ গ্রামকে ভিত্তি করেই ক্যালরি, প্রোটিন, চর্বি, কার্বোহাইড্রেট, চিনি ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের হিসাব দেওয়া হয়।
অর্থাৎ সার্ভিং সাইজ তথ্য বোঝার একটি মানদণ্ড।
তাহলে পোরশন সাইজ কী?
অন্যদিকে পোরশন সাইজ হলো একজন মানুষ বাস্তবে একবারে যতটুকু খাবার খাচ্ছেন। এটি ব্যক্তিভেদে, ক্ষুধা, অভ্যাস, খাবারের ধরন এবং পরিবেশের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।
ধরা যাক, একটি প্যাকেট চিপসের লেবেলে লেখা আছে এক সার্ভিং ২৮ গ্রাম। কিন্তু আপনি বসে পুরো প্যাকেটটি খেয়ে ফেললেন। সে ক্ষেত্রে আপনার পোরশন সাইজ হতে পারে এক সার্ভিংয়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
এখানেই সমস্যার শুরু।
লেবেলে যদি প্রতি সার্ভিংয়ে ১৫০ ক্যালরি লেখা থাকে, কিন্তু আপনি তিন সার্ভিং খান, তাহলে মোট ক্যালরি হবে ৪৫০। শুধু প্যাকেটের সামনের বড় অঙ্কটি দেখলে বিষয়টি বোঝা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের খাবারে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশিদের প্রধান খাবার ভাত। অনেকের ক্ষেত্রে ‘এক প্লেট ভাত’ বলতে নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ বোঝায় না। কারও প্লেটে এক কাপ ভাত, আবার কারও প্লেটে দুই থেকে তিন কাপ ভাতও থাকতে পারে।
একইভাবে, এক বাটি খিচুড়ি, এক গ্লাস শরবত, এক টুকরা মাংস বা এক মুঠো বাদাম এসবের পরিমাণও ব্যক্তি ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে যায়।
তাই ‘আমি তো শুধু একবারই খেয়েছি’ এটি খাবারের পরিমাণ বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। একবারে কতটুকু খেয়েছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে রেস্টুরেন্টে খাওয়ার সময় বিষয়টি আরও চোখে পড়ে। বাড়িতে যে পরিমাণ ভাত বা নুডলস খাওয়া হয়, বাইরে অনেক সময় তার চেয়ে বড় পোরশন পরিবেশন করা হয়। ফলে না বুঝেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাওয়া হয়ে যেতে পারে।
বেশি খাওয়া হচ্ছে, অথচ বোঝা যাচ্ছে না
খাবারের পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে শুধু ক্যালরিই বাড়ে না; খাবারের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত চিনি, লবণ, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেটও শরীরে যেতে পারে।
ধরা যাক, কেউ এক গ্লাস দুধের বদলে একসাথে দুই গ্লাস দুধ পান করলেন। আবার কেউ এক সার্ভিং আইসক্রিমের পরিবর্তে দুই সার্ভিং খেলেন। প্রতিবারই যদি লেবেলের তথ্যকে একটি সার্ভিং ধরে নেওয়া হয়, তাহলে মোট গ্রহণের হিসাব ভুল হবে।
তাই প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় শুধু ‘কত ক্যালরি’ দেখলেই হবে না; এক প্যাকেটে কয়টি সার্ভিং আছে এবং আমি আসলে কত সার্ভিং খাচ্ছি দুটিই দেখতে হবে।
কীভাবে নিজের পোরশন নিয়ন্ত্রণ করবেন?
খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের জন্য খুব জটিল কোনো নিয়মের প্রয়োজন নেই। কয়েকটি অভ্যাসই কাজে আসতে পারে।
প্রথমত, প্যাকেটজাত খাবারের Nutrition Facts বা পুষ্টি - তথ্য লেবেল পড়ার অভ্যাস করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বড় প্লেটের বদলে তুলনামূলক ছোট প্লেট বা বাটি ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে একবারে অতিরিক্ত খাবার নেওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
তৃতীয়ত, খুব দ্রুত খাবার না খেয়ে ধীরে খাওয়া এবং শরীরের ক্ষুধা ও পেট ভরে যাওয়ার সংকেতের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। একই সাথে টেলিভিশন বা মোবাইল দেখতে দেখতে খাওয়ার অভ্যাস কমানোও উপকারী।
তবে পোরশন নিয়ন্ত্রণ মানে খাবার বাদ দেওয়া নয়। বরং সুষম খাদ্যতালিকায় প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে খাবার গ্রহণ করাই মূল কথা।
ভাত কমানোই কি সমাধান?
অনেকেই পোরশন কন্ট্রোল বলতে শুধু ভাত কমানোকে বোঝেন। বিষয়টি এতটা সরল নয়। একটি সুষম খাবারে শর্করা, প্রোটিন, শাকসবজি, ফল, স্বাস্থ্যকর চর্বি- সবকিছুরই যথাযথ ভূমিকা রয়েছে।
একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রয়োজনও বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই সবার জন্য একই পরিমাণ খাবারকে আদর্শ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত কী খাচ্ছি, কতটুকু খাচ্ছি এবং কতবার খাচ্ছি এই তিনটি বিষয় সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
সচেতনতার শুরু প্লেট থেকেই
খাবারের ক্ষেত্রে ‘একটু বেশি’ অনেক সময় চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু প্রতিদিনের সামান্য অতিরিক্ত গ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে চললে তার প্রভাব শরীরের ওজন ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যে পড়তে পারে।
তাই সার্ভিং সাইজ ও পোরশন সাইজ- এর পার্থক্য জানা কেবল পুষ্টিবিদদের জন্য নয় , বরঞ্চ সাধারণ মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের প্যাকেটের লেবেল থেকে শুরু করে নিজের প্লেট সব জায়গাতেই পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সার্ভিং সাইজ বলে দেয় পুষ্টির হিসাবটি কোন পরিমাণকে ভিত্তি করে করা হয়েছে। আর পোরশন সাইজ বলে দেয় আপনি বাস্তবে কতটুকু খাচ্ছেন। এই পার্থক্যটি বুঝতে পারলেই খাবারের প্রতি আমাদের সচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে যায়।
রাইসা মেহজাবীন
ফিটনেস পুষ্টিবিদ
বি.এসসি (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ডিইউ
এমপিএইচ (চলমান), পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
পিজিটি (Nutrition and Fitness Training), ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার
স্পেশালাইজড ইন ফিটনেস নিউট্রিশন ট্রেনিং, নিউট্রিশন সলিউশনস
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ



