যশোরে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন জামায়াতের পাঁচজন সংসদ সদস্য।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১ টায় প্রেসক্লাব যশোরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যশোর জেলা শাখার উদ্যোগে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুল।
সংবাদ সম্মেলনে সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বঞ্চিত করা, গুদামঘর না থাকা সত্ত্বেও লাইসেন্স দেওয়া এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। এ সময় এসব অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন নথিপত্র ও তথ্য-প্রমাণ থাকার দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে যশোরের বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকায় সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। দাবি করেন, কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। আবার যারা লাইসেন্স পেয়েছেন, তাদের কারও কারও নিজস্ব গুদামঘর নেই। কোথাও ভাড়ার গুদাম দেখিয়ে, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
মণিরামপুর পৌরসভা, ঝিকরগাছা, চৌগাছা, যশোর সদর, অভয়নগর ও বাঘারপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে তিনি এসব অভিযোগ করেন। দাবি, কিছু লাইসেন্সধারীর সাথে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক বা পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে।
মণিরামপুর পৌরসভার মেসার্স নাফিজ এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সওদাগর ট্রেডার্স, চৌগাছার মেসার্স রুস্তম আলী ট্রেডার্স এবং অভয়নগরের মেসার্স মনিরুল ফারাজীসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ও মালিকদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মণিরামপুরের ঝাপা ইউনিয়নের মেসার্স লাকি এন্টারপ্রাইজ, শ্যামকুড় ইউনিয়নের একটি প্রতিষ্ঠান এবং নেহালপুরের মেসার্স সরদার এন্টারপ্রাইজের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়।
বাঘারপাড়া উপজেলার দেহারপাড়া ও বসুন্দিয়া ইউনিয়নের কয়েকজন লাইসেন্সধারীর রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সংশ্লিষ্টতা এবং ব্যবসায়িক যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বক্তারা। তাদের অভিযোগ, কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার তথ্য রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সধারীদের বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে পাওয়া যায়নি।
সার ডিলার নিয়োগের অনিয়ম তদন্তে গঠিত কমিটি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, যারা ডিলার নিয়োগের সুপারিশ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলেন, তাদের নিয়েই আবার তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফলে এই কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে তাদের আস্থা নেই।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যে অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, তিনি জাতীয় সংসদের কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে গত ৫ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সার ডিলার নিয়োগ ও মনিটরিং কমিটি গঠন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, গত ২৭ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ে ১৩ সদস্যের কমিটিতে জেলা প্রশাসককে সভাপতি এবং উপজেলা পর্যায়ে ১০ সদস্যের কমিটিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করা হয়েছে।
কমিটিতে কৃষক, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ থাকলেও সংসদ সদস্যদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রাখা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
অধ্যাপক গোলাম রসুলের দাবি, যশোরের পাঁচ সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে জেলা পর্যায়ের কমিটিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ততা বাদ দেওয়ার ফলে ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রকৃত ও অভিজ্ঞ সার ব্যবসায়ীদের ডিলারশিপ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, যারা দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে সততা ও দক্ষতার সাথে সার বিক্রির ব্যবসা করছেন, তাদের যোগ্যতা বিবেচনা করে লাইসেন্স দেওয়া উচিত।
তাদের মতে, সার ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হলে আগামী মৌসুমে কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সার পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন। অতীতেও কৃষকদের বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে বলে অভিযোগ করে তারা বলেন, বর্তমান নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম অব্যাহত থাকলে কৃষি খাতে সংকট আরও বাড়তে পারে।
সংসদ সদস্যরা সার ডিলার নিয়োগের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের মূল্যায়ন এবং কৃষকদের জন্য ন্যায্যমূল্যে সার সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সধারী, জেলা প্রশাসন ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য মাওলানা আজীজুর রহমান, যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ এবং যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোস্তার আলী। যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক হাসপাতালে ভর্তি থাকায় উপস্থিত হতে পারেননি বলে জানানো হয়।
এ ছাড়া জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবু জাফর সিদ্দিকী, সহকারী সেক্রেটারি গোলাম কুদ্দুস ও মণিরুল ইসলাম, প্রচার সেক্রেটারি শাহাবুদ্দিন বিশ্বাস, শহর আমির মাওলানা ইসমাইল হোসেনসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।


