...|...|...

জাতীয়

সরকারের ছয় মাস নিয়ে যে মূল্যায়ন করল সিপিডি

টাইমস টুুডে প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, বিকেল ৩:৪৭ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ২:০২
Shares
সরকারের ছয় মাস নিয়ে যে মূল্যায়ন করল সিপিডি

নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতির কিছু সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের পথে এখনো নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সংস্থাটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি হলেও রাজস্ব আদায়, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে আয়োজিত এক মিডিয়া সংলাপে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রমের পর্যালোচনা তুলে ধরেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

তিনি বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রমে মিশ্র চিত্র পাওয়া গেলেও নেতিবাচক প্রবণতার আধিক্য রয়েছে। এর বড় একটি অংশ কাঠামোগত সমস্যা।

সিপিডির পর্যালোচনায় শাসন ও প্রশাসন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, জ্বালানি ও পরিবহন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষাসহ নয়টি খাতের ৩৬২টি পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবে নেওয়া পদক্ষেপের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি কমলেও কমেনি জীবনযাত্রার চাপ
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।

তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো বেশি। প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক থাকায় মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি বলে মনে করছে সংস্থাটি।

রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগে উদ্বেগ
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে সিপিডি। সংস্থাটির হিসাবে, মার্চ থেকে মে সময়ে মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে।

সিপিডির আশঙ্কা, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে। এতে উন্নয়ন ব্যয়, বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) কাটছাঁটের চাপ বাড়তে পারে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের বরাদ্দ সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

বিনিয়োগ পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয় বলে জানিয়েছে সিপিডি। ফেব্রুয়ারি থেকে জুন সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক হয়েছে। কমেছে নিট বিদেশি বিনিয়োগও।

গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদনে ধাক্কা
চলমান গ্যাস সংকটকে শিল্প ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, বিকল্প এলএনজি কার্গো সংগ্রহে জটিলতা এবং সরবরাহ পরিকল্পনার দুর্বলতার কারণে গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পে এর প্রভাব পড়েছে। মার্চ-এপ্রিল সময়ে শিল্প উৎপাদনের সাধারণ সূচক এবং উৎপাদনশিল্পের সূচক-টির প্রবৃদ্ধিই শূন্যে নেমে এসেছে। একই সময়ে শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহারও কমেছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সময়বদ্ধ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কৌশলগত জ্বালানি মজুত, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার সুপারিশ করেছে সিপিডি।

ব্যাংক খাতে সংস্কার শুরু হলেও আস্থা নিয়ে প্রশ্ন
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সরকারের কয়েকটি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে সিপিডি। এর মধ্যে পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংক একীভূত করা এবং সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যাংক রেজুলেশন আইন প্রয়োগের বিষয়টি উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা, শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ প্রয়োজন বলে মনে করছে সিপিডি।

রিজার্ভ বাড়লেও বহিঃখাতে চাপ
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি হলেও বহিঃখাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ আগস্টের মধ্যে বিপিএম-৬ হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

তবে একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে এবং চলতি হিসাবের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে গেছে। প্রবাসী আয় ও বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধিও কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে এর অন্যতম প্রভাবক হিসেবে দেখছে সিপিডি।

পুনরুদ্ধার ধীরগতির পেছনে কাঠামোগত সমস্যা
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ধীরগতির পেছনে সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার কর্মসূচির অভাব, দুর্বল রাজস্ব ও আর্থিক কাঠামো, বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের চাপ, প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতিকে দায়ী করেছে সিপিডি।

সংস্থাটির মতে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুধু মূল্যস্ফীতি কমার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা যাবে না। মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার ও সুদের হারে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও দৃশ্যমান উন্নতি প্রয়োজন।

সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচির পরামর্শ
দীর্ঘায়িত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করতে আগামী অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত একটি বাস্তবসম্মত ‘কোর বাজেট’ প্রস্তুতের পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। বাস্তব সময়ের তথ্য ও বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক কাঠামোর ভিত্তিতে এ বাজেট তৈরির কথা বলেছে সংস্থাটি।

পাশাপাশি জ্বালানি, ব্যাংক সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসন, উন্নয়ন ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণ, নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা ও ডিজিটালাইজেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং সংসদের কাছে নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছে সিপিডি।

সামগ্রিক মূল্যায়নে সংস্থাটি বলছে, সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু সংস্কারমূলক ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অর্থনীতির প্রধান কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তাই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত, বাস্তবসম্মত ও জবাবদিহিমূলক সংস্কার কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।