সময়কে থামিয়ে দিতে চান অ্যান কারসন। ঘড়ির কাঁটা থামিয়ে নয়, পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিয়েও নয়। তিনি চান এমন এক মুহূর্ত, যেখানে মন এতটাই নিমগ্ন হয়ে উঠবে যে সময়ের অস্তিত্বই ভুলে যেতে হবে। হতে পারে তা সেরা কবিতাটি লেখার মুহূর্ত, হতে পারে নেটফ্লিক্সে দেখা কোনো সিনেমার দৃশ্য। মুহূর্তটি যখন আপনাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে, তখন আর সময় বয়ে যায় না। আপনি যেন সময়ের বাইরে চলে যান।
এই সময়হীনতার অনুসন্ধান, ভাষার অনিশ্চয়তা আর সাহিত্যের চেনা সীমানা ভেঙে দেওয়ার প্রবণতাই অ্যান কারসনের লেখার জগৎকে আলাদা করে তোলে। ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কানাডীয় এই কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের পণ্ডিত। ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যে নতুন আঙ্গিক নির্মাণের জন্য তাকে এই সম্মান দিয়েছে সুইডিশ অ্যাকাডেমি।
কিন্তু কারসনের সাহিত্যকে শুধু পুরস্কারের পরিচয়ে আটকে রাখা যায় না। তার কাছে ভুল কোনো লজ্জা নয়, শূন্যতা নিছক শূন্য নয়, আর অনুবাদও এক ভাষার অর্থ অন্য ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার সরল প্রক্রিয়া নয়। তার সাহিত্য যেন আমাদের এমন এক জগতে নিয়ে যায়, যেখানে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াই শেষ কথা নয়; কখনো কখনো উত্তর পাওয়ার আগের অপেক্ষাটুকুই সবচেয়ে মূল্যবান।
সাত বছর পর তার নতুন মৌলিক বই Wrong Norma (ভুল মানদণ্ড) প্রকাশের পর দ্য প্যারিস রিভিউ–এর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে এসেছে এসব ভাবনা। কথোপকথনে কারসন যেন আমাদের এমন এক দরজা খুলে দেন, যার ওপারে রয়েছে ভুল হওয়ার স্বাধীনতা, হারিয়ে যাওয়া শব্দের স্মৃতি এবং সময়কে ভুলে থাকার এক অদ্ভুত আনন্দ।
শূন্যতারও একটা ভাষা আছে
অ্যান কারসনের লেখায় শূন্যতা নিছক ফাঁকা জায়গা নয়। বরং সেখানে অনুপস্থিতি নিজেই এক ধরনের উপস্থিতি হয়ে ওঠে। আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকিয়াভিকে স্বামী রবার্ট কারির সঙ্গে বছরের কিছু সময় কাটান তিনি। ২০০৮ সাল থেকে তাদের এই যাতায়াত। এক সাক্ষাৎকারে কারসন আমেরিকার প্রকৃতিকে বর্ণনা করেছেন ঘন, উদ্ভিদে পরিপূর্ণ এক জগৎ হিসেবে। বিপরীতে আইসল্যান্ড তার কাছে লাভা, সমুদ্র আর অল্প কয়েকটি রেখায় আঁকা এক বিস্তীর্ণ শূন্যতা। এই শূন্যতার মধ্যে যেন তার নিজের লেখারই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়।

প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার অনেক অংশ সময়ের গর্ভে হারিয়ে গেছে। যে পঙ্ক্তিগুলো টিকে আছে, সেগুলোর মধ্যেও রয়েছে ছেঁড়া বাক্য, ভাঙা অর্থ, অনুপস্থিত শব্দের চিহ্ন। অনুবাদ করতে গিয়ে কারসন সেই ফাঁকগুলোকে নির্বিচারে পূরণ করে দিতে চান না। বরং বন্ধনী ও শূন্যস্থানের সাহায্যে পাঠককে মনে করিয়ে দেন, এখানে কিছু একটা ছিল, যা এখন আর আমাদের কাছে নেই।
এই অনুপস্থিতিকে মুছে ফেললে ইতিহাসের ক্ষতটিও মুছে যায়। অথচ ক্ষতটুকু দৃশ্যমান থাকলেই বোঝা যায়, সময় আমাদের কাছ থেকে কী নিয়ে গেছে।
তার Nox (লাতিন শব্দ, যার অর্থ রাত/রজনী) বইটিতেও অনুপস্থিতি ও শোকের এমনই এক জগৎ তৈরি হয়েছে। ভাইয়ের মৃত্যুকে ঘিরে লেখা এই বইয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতি, শোক, অনুবাদ ও হারিয়ে যাওয়া অতীত পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যেন একজন মানুষকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তার সম্পর্কে যা জানা আছে তা বলা নয়; বরং যা আর কখনো জানা যাবে না, তার পাশেও নীরবে বসে থাকা।
কারসনের কাছে শূন্যতা তাই শেষ হয়ে যাওয়ার নাম নয়। কখনো কখনো শূন্যতাই বলে দেয়, কী একসময় সেখানে ছিল।
ভুলের ভেতর মুক্তি
Wrong Norma- নামের মধ্যেই রয়েছে ভুলের প্রতি এক অদ্ভুত টান। কেন ভুল? কেন ঠিক হওয়ার বদলে ভুলকে সামনে আনা?
কারসনের উত্তরে রসিকতা আছে, আবার আছে প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের প্রতি সূক্ষ্ম বিদ্রূপ। কানাডীয়দের সম্পর্কে তার মজার মন্তব্য- তারা ভদ্র, কিন্তু ভুল। তবে ভুলের প্রতি তার আগ্রহের পেছনে আরও গভীর একটি অভিজ্ঞতা কাজ করেছে: একাডেমিক জগতের নিরন্তর নির্ভুল থাকার চাপ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভুল হওয়া মানে অনেক সময় নিজের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়া। গবেষণা, পদোন্নতি কিংবা পেশাগত স্বীকৃতির পথে মানুষ ক্রমাগত প্রমাণ করতে চায়, সে জানে; সে ঠিক; তার সিদ্ধান্ত নির্ভুল। এই ব্যবস্থায় ভুল যেন এমন এক অপরাধ, যা যত্ন করে আড়াল করতে হয়। কারসন সেই মানসিকতার বিপরীতে দাঁড়ান।
তার ভাবনায় প্রভাব রয়েছে দার্শনিক সিমোন ভেইলের। স্ববিরোধ, অনিশ্চয়তা কিংবা পরস্পরবিরোধী ধারণাকে একসঙ্গে জায়গা দিতে পারলে মন নিজের কঠিন কাঠামো থেকে কিছুটা মুক্ত হয়। তখন পরিচিত চিন্তার বাইরে অন্য কোনো দৃশ্য দেখা দিতে পারে। ভুল সেই দৃশ্যের দিকে খোলা একটি দরজা।

এর অর্থ এই নয় যে সত্যের কোনো মূল্য নেই, কিংবা সব ভুলই সমানভাবে অর্থবহ। বরং ভুল হওয়ার সম্ভাবনাকে মেনে নেওয়া মানে নিজের চিন্তাকে চূড়ান্ত বলে ঘোষণা না করা। যে মন নিজের সংশোধনের জন্য জায়গা রাখে, নতুন কিছু আবিষ্কারের সম্ভাবনাও তার কাছে খোলা থাকে।
কারসনের সাহিত্যেও তাই নির্ভুলতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে অনুসন্ধান। তিনি যেন বলতে চান, কখনো কখনো ঠিক হওয়ার তাড়নাই আমাদের দেখার ক্ষমতাকে সংকুচিত করে ফেলে।
দুটি ভাষার মাঝখানে যে খাদ
অনুবাদককে কল্পনা করা যাক দুটি ভূখণ্ডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ হিসেবে। এক পাশে একটি ভাষা, অন্য পাশে আরেকটি। মাঝখানে খাদ। সেতু নির্মাণের চেষ্টা চলে, কিন্তু দুই তীর কখনোই পুরোপুরি এক হয়ে যায় না।
একটি শব্দের অর্থ অভিধানে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দ্ব্যর্থতা, ধ্বনি, স্মৃতি কিংবা যে সাংস্কৃতিক পরিসরে শব্দটি বেঁচে আছে, তার সবটুকু কি অন্য ভাষায় পৌঁছে দেওয়া যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই অনুবাদককে বারবার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একটি শব্দ বেছে নিলে অন্যটি হারিয়ে যায়। একটি অর্থকে সামনে আনলে আরেকটি অর্থ আড়ালে পড়ে। অথচ বাদ পড়ে যাওয়া অর্থটিও হয়তো সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কারসনের কাছে অনুবাদ এই অসম্ভবতার সঙ্গেই বসবাস করার শিল্প।

এখানে এমিলি ডিকিনসনের কথা মনে পড়ে। নিজের কবিতার পাণ্ডুলিপিতে ডিকিনসন প্রায়ই একটি শব্দ কেটে অন্য শব্দ বসাতেন, কখনো পাশাপাশি রেখে দিতেন একাধিক বিকল্প। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই কবিতার একাধিক সংস্করণ পাওয়া যায়। ফলে কবিতাটি যেন একটি স্থির বস্তু নয়; বরং সম্ভাবনার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা।
কোন শব্দটি শেষ পর্যন্ত কবিতার? প্রথমটি, দ্বিতীয়টি, নাকি দুটির মাঝখানে তৈরি হওয়া সেই অদৃশ্য দূরত্ব?
মুদ্রিত বইয়ের পৃষ্ঠায় এই সমস্ত সম্ভাবনাকে একসঙ্গে ধরে রাখা কঠিন। ডিজিটাল মাধ্যমে লিংক কিংবা বিকল্প পাঠের সাহায্যে কিছুটা চেষ্টা করা যায়। কিন্তু কবিতার ভেতরে একই সঙ্গে একাধিক অর্থের উপস্থিতি যে অভিজ্ঞতা তৈরি করে, তার সূক্ষ্মতা পুরোপুরি ধরা পড়ে না।
কারসনের কাছে এই অসম্পূর্ণতাই ভাষার সীমা, আবার তার সৌন্দর্যও। কারণ, কোনো কিছু পুরোপুরি ধরা না পড়ার মধ্যেও তার অস্তিত্ব অনুভব করা যায়।
শিয়ালের পেছনে ছুটে লেখক
একটি লেখা কোথা থেকে আসে? লেখক কি আগে থেকেই জানেন, কোথায় যাবেন? নাকি লেখার কাজটি শুরু হয় কেবল একটি অস্পষ্ট আকর্ষণ থেকে?
কারসনের কাছে লেখার অভিজ্ঞতা অনেকটা উঠোন পেরিয়ে ছুটে যাওয়া শিয়ালের পেছনে ছোটা। শিয়ালটি কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, তার গর্ত কোথায়- কিছুই নিশ্চিত নয়। তবু তাকে অনুসরণ করতে ইচ্ছে হয়।
Wrong Norma বইয়ের শিয়ালটির জন্মও এমনই আকস্মিকতায়। আইসল্যান্ডীয় শিল্পী রাগনার কিয়ারতানসনের The Visitors–এর রেকর্ডের ভূমিকা লিখতে গিয়ে আঁকতে আঁকতে খাতায় শিয়ালটির আবির্ভাব হয়। চিত্রটি এতটাই ভালো লেগেছিল যে শেষ পর্যন্ত তাকে বইয়ের কোথাও জায়গা করে দিতে হয়।

ঘটনাটি ছোট, কিন্তু লেখালেখি সম্পর্কে কারসনের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সাহায্য করে। সবকিছুর আগে পরিকল্পনা, কাঠামো ও কৌশল ঠিক করে নেওয়া তার পদ্ধতি নয়। তিনি বরং কোনো একটি বিষয়কে অনুসরণ করতে চান- যতক্ষণ না সেটি তাকে সত্যের কাছাকাছি কোথাও নিয়ে যায়।
লেখার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তার প্রতিক্রিয়াও বেশ স্পষ্ট। চরিত্র নির্মাণ, দৃষ্টিকোণ কিংবা আখ্যানের কারিগরি নিয়ম নিয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামানোর চেয়ে তিনি কোনো একটি বিষয়কে গভীরভাবে অনুসরণ করার পক্ষে। বিষয়টিকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যেখানে তার সত্যটি ধরা দেয়।
এখানে লেখক যেন শিকারি নন, অনুসরণকারী। তার কাজ শিয়ালটিকে নিজের ইচ্ছামতো চালানো নয়; বরং শিয়ালটি যে পথে যাচ্ছে, সেই পথের শেষ দেখতে চাওয়া।
আলোর সঙ্গে গোপন চুক্তি
লেখালেখির পেছনে কারসন আরও একটি নিঃশব্দ চুক্তির কথা বলেন- আলোর সঙ্গে চুক্তি। দিনের আলো ঠিক কেমন, সেই মুহূর্তের আলোকে কীভাবে শব্দে ধরা যায়, তা নিয়ে তার এক ধরনের ব্যক্তিগত দায় রয়েছে। যেন প্রতিদিনের আলোকে একটি নোটবুকে যথাযথভাবে ধরে রাখতে হবে। সেই খাতা কেউ পড়বে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। লেখার কাজটি প্রথমত নিজের কাছে দায়বদ্ধ থাকার কাজ।
এই ভাবনার মধ্যে এক ধরনের নির্জনতা আছে। পৃথিবীর কাছে লেখক কী বলবেন, পাঠক কীভাবে গ্রহণ করবেন, বইটি কতজন পড়বেন- এসবের আগেও রয়েছে আরও ব্যক্তিগত একটি মুহূর্ত। লেখক ও তার দেখা পৃথিবীর মধ্যে ঘটে যাওয়া এক নীরব সাক্ষাৎ।
একজন মানুষ হয়তো সারাদিন নানা কথা বলেন, দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য কাজে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু হঠাৎ কোনো বিকেলে জানালার আলো, দেয়ালের ছায়া কিংবা গাছের পাতায় জমে থাকা রং তার কাছে এমন কিছু হয়ে উঠতে পারে, যা উপেক্ষা করা অসম্ভব। সেই মুহূর্তটিকে শব্দে ধরে রাখাই হয়তো লেখকের কাজ।
আর কখনো কখনো সেই আলোকে ধরে রাখার মধ্যেই দিনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন হয়ে যায়।
মৃত্যুর ওপার থেকে আসা পথিক
কারসনের জীবনের একটি ঘটনা যেন তার সাহিত্যিক জগতেরই কোনো রহস্যময় গল্প। গ্রিক পুরাণে হার্মিস শুধু দেবতাদের বার্তাবাহক নন; মৃতের আত্মাকে পরপারের পথে এগিয়ে দেওয়ার সঙ্গেও তার সম্পর্ক রয়েছে। কারসন একবার স্বামী রবার্ট কারির সঙ্গে মিশিগানের একটি নির্জন রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় এক হিচহাইকারকে তুলে নিয়েছিলেন। লোকটির পরনে ছিল পরিপাটি নীল স্যুট, গায়ে নতুন ধোয়া কাপড়ের গন্ধ। তিনি তেমন কোনো কথা বলেননি। কিছু দূর যাওয়ার পর একটি পাঠাগারের সামনে নেমে যান। সেদিনই মারা যান কারির বাবা।
ঘটনাটিকে কারসন এক অদ্ভুত তাৎপর্যে মনে রেখেছেন। তার বিশ্বাস, সেই রহস্যময় পথিক যেন হার্মিসের মতোই এক পথপ্রদর্শক ছিলেন।

এটি অবশ্যই তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা; এর কোনো প্রমাণিত অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু সাহিত্য ও স্মৃতির জগতে কোনো ঘটনার অর্থ সব সময় প্রমাণের নিয়মে তৈরি হয় না। কখনো কখনো একটি আকস্মিক ঘটনা পরবর্তী কোনো শোকের সঙ্গে এমনভাবে জুড়ে যায় যে, দুটিকে আলাদা করে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে।
মৃত্যুর আগে পথিকটির আবির্ভাব, তার নীরবতা, পাঠাগারের সামনে নেমে যাওয়া- সব মিলিয়ে স্মৃতিটি যেন বাস্তব ও পুরাণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে।
কারসনের লেখায় এই মাঝখানের জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে নিশ্চিত ব্যাখ্যা নেই, অথচ অর্থের সম্ভাবনা মুছে যায়নি। যেখানে একটি ঘটনা একই সঙ্গে দৈনন্দিন ও রহস্যময় হয়ে উঠতে পারে।
অভিধানের পাতায় হারিয়ে যাওয়া সময়
কারসনের সাম্প্রতিক ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ- ‘হেজিটেশন’, অর্থাৎ ইতস্তত করা, একটু থেমে থাকা, সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে অপেক্ষা করা।
প্রাচীন গ্রিক পড়ার সময় অচেনা কোনো শব্দের অর্থ জানতে তাকে অভিধান বা লেক্সিকনের পাতা উল্টাতে হতো। শব্দটি খুঁজে বের করা, তার অর্থ বোঝা, প্রসঙ্গের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা- সব মিলিয়ে সময় লাগত। আর সেই সময়ের মধ্যবর্তী ফাঁকেই ঘটত অদ্ভুত এক ব্যাপার।
প্রশ্নটি মাথায় আছে, কিন্তু উত্তরটি এখনো এসে পৌঁছায়নি। মন কাজ করছে, আবার পুরোপুরি চিন্তার ভেতরেও প্রবেশ করেনি। অর্থের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মানুষ কিছুক্ষণের জন্য যেন চিন্তার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকে।
কারসন এই অবস্থাকে মূল্যবান মনে করেন। কারণ, অভিধানের পাতায় শব্দ খুঁজতে খুঁজতে শুধু একটি অর্থ পাওয়া যায় না; শব্দটির ইতিহাস, তার অন্য ব্যবহার, সম্ভাব্য ব্যঞ্জনা- সবকিছুর সঙ্গেও পরিচয় ঘটে। উত্তর পাওয়ার আগের সময়টুকুতে মন নানা সম্ভাবনার মধ্যে ভেসে বেড়াতে পারে।

এখন একটি শব্দ না জানলে কম্পিউটারে ক্লিক করলেই অর্থ সামনে চলে আসে। দ্রুততা বেড়েছে, কাজ সহজ হয়েছে। কিন্তু শব্দের ইতিহাস কিংবা তার বিকল্প অর্থের ভেতর ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ কমে গেছে। কারসনের আক্ষেপ এখানেই।
তিনি প্রযুক্তির সুবিধাকে অস্বীকার করছেন না; বরং প্রশ্ন তুলছেন, দ্রুত উত্তর পেতে গিয়ে আমরা কি উত্তর আসার আগের মূল্যবান সময়টুকুও হারিয়ে ফেলছি?
তার কাছে এই বিরতি এক ধরনের ‘অনুপস্থিত উপস্থিতি’। চিন্তা যেন এখনো আসেনি, কিন্তু তার আগমনের আভাস রয়েছে। এটি অজ্ঞতার অন্ধকারে আটকে থাকা নয়; বরং জানার দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক অন্তর্বর্তী অবস্থা।
সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, এই অপেক্ষায় মনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না। বরং তাকে একটু অবকাশ দিতে হয়। উত্তরটি তৈরি হওয়ার আগেই তাকে টেনে বের করে আনার চেষ্টা না করে, তার আসার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কারসন এই হারিয়ে যাওয়া বিরতিটুকুকেই ফিরে পেতে চান।
শূন্যতার ভেতর নিজেকে হারানো
লেখক ও শিল্পী জন কেজের একটি ভাবনা কারসনের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে: প্রতিটি বস্তু বা অস্তিত্ব যেন তাকে ধারণ করে রাখা শূন্যতারই উদ্যাপন।
লেখকদের ক্ষেত্রে এই ভাবনার একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। প্রত্যেক মানুষেরই স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত পছন্দের একটি ভাণ্ডার থাকে। লেখক সেই ভাণ্ডার থেকে উপাদান নিয়ে বারবার নিজের আত্মজীবনীকেই নতুন করে লিখতে পারেন। কিন্তু কারসনের মতে, একসময় এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
নিজের পরিচিত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি না করে বাইরের কোনো বিষয়কে অনুসরণ করা, নিজের অহমকে একটু সরিয়ে রাখা- এভাবেই হয়তো নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি তার লেখার অন্য ভাবনাগুলোর সঙ্গেও মিলে যায়। ভুলের প্রতি তার আগ্রহ, শূন্যতার প্রতি আকর্ষণ, অনুবাদের অসম্পূর্ণতা কিংবা অভিধান হাতড়ে পাওয়া বিরতি- সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতা থেকে সরে আসার চেষ্টা।

আমরা সাধারণত শূন্যতাকে ভয় পাই। উত্তর না থাকলে অস্বস্তি হয়, ভুল হলে বিব্রত হই, কোনো কাজের ফল দ্রুত না এলে অধৈর্য হয়ে উঠি। আমরা চাই সবকিছুর ব্যাখ্যা থাকুক, প্রতিটি শব্দের অর্থ নির্দিষ্ট হোক, প্রতিটি মুহূর্তের একটি ব্যবহার থাকুক।
কারসন যেন সেই তাড়নার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, সব ফাঁক পূরণ করতে নেই। সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পেতে নেই। সব সম্ভাবনার মধ্যে একটি বেছে নিয়ে বাকিগুলো মুছে ফেলাও জরুরি নয়।
কখনো কখনো অজানা জায়গাটুকু অজানাই থাকুক। কখনো ভুলের মধ্যেই নতুন পথ খুলে যাক। কখনো একটি শব্দের অর্থ খুঁজতে খুঁজতে আমরা শব্দটির চেয়েও বড় কোনো অভিজ্ঞতার কাছে পৌঁছে যাই।
আর কখনো একটি কবিতা, একটি দৃশ্য কিংবা কোনো অচেনা পথিকের স্মৃতি আমাদের এমনভাবে গ্রাস করুক, যেন সময় আর এগোচ্ছে না।
হয়তো অ্যান কারসনের কাছে লেখালেখির সবচেয়ে বড় আনন্দ সেখানেই- পৃথিবীকে পুরোপুরি বুঝে ফেলার মধ্যে নয়, বরং বোঝার পথে নিজেকে হারিয়ে ফেলার মধ্যে। একটি বাক্য শেষ হয়। আরেকটি বাক্য শুরু হয়। মাঝখানে থেকে যায় সামান্য অন্ধকার।
আমরা তবু কথা বলি, লিখি, অনুবাদ করি।
কারণ, অন্ধকারের ওপারে কী আছে, তা না জেনেও ঝাঁপ দেওয়ার নামই হয়তো সাহিত্য।

