...|...|...

সারাদেশ

মাটির ব্যাংকে জমছে টাকা, পাঠাগার ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন গ্রামবাসী

লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১০:৫৭
Shares
মাটির ব্যাংকে জমছে টাকা, পাঠাগার ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন গ্রামবাসী

ছবি: টাইমস টুডে

সংসারের খরচ মেটানোর পর যা থাকে, তা থেকেই কেউ জমাচ্ছেন দুই টাকা, কেউ পাঁচ, আবার কেউ ১০ থেকে ২০ টাকা। মাটির ছোট্ট ব্যাংকে জমছে তাদের সেই সঞ্চয়। তিন মাস পর ব্যাংক ভেঙে জমানো টাকা তুলে দেওয়া হচ্ছে গ্রামের পাঠাগারের উন্নয়নে। একেকটি ব্যাংকে জমে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। টাকার অঙ্কে সঞ্চয় সামান্য, কিন্তু এর সাথে জড়িয়ে আছে গ্রামের মানুষের ভালোবাসা, মমত্ববোধ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করার স্বপ্ন।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ইউনিয়নের টিপার বাজার এলাকার ‘সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগার’ ঘিরে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ। পাঠাগারের উন্নয়ন, নতুন বই ও বাদ্যযন্ত্র কেনা এবং ভবনের দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজে সহযোগিতা করতে মাটির ব্যাংকে টাকা জমাচ্ছেন ২০টি কৃষক পরিবারের সদস্যরা। একসাথে বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও সামান্য সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে তারা হয়ে উঠেছেন গ্রামের জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নের অংশীদার।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এ উদ্যোগে এখন পর্যন্ত জমা হয়েছে ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা। পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা জামাল হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কৃষক পরিবারগুলোর মাটির ব্যাংকে জমা হওয়া অর্থ থেকেই এ টাকা এসেছে। তাদের প্রত্যাশা, ছোট ছোট সঞ্চয় একসময় পাঠাগারের বড় উন্নয়নকাজে ভূমিকা রাখবে।

২০১৪ সালে মাত্র ১০টি বই নিয়ে পাঠাগারটির যাত্রা শুরু হয়। স্থানীয় কলেজশিক্ষার্থী জামাল হোসেনের উদ্যোগে একটি ছোট ও জীর্ণ টিনশেড ঘরে এর কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। সময়ের সাথে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পৃষ্ঠপোষকতায় পাঠাগারটি এখন গ্রামের জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে বইয়ের সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে।

পাঠাগারটির রয়েছে নিজস্ব ভবন। দ্বিতল ভবনের ভিত্তির ওপর একতলার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০ লাখ টাকার বেশি। এর প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থ সহায়তা দিয়েছেন ঢাকার রবিন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজ লিমিটেডের পরিচালক শাহীন হোসেন এবং মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। বাকি প্রায় ১০ শতাংশ অর্থ এসেছে স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে।

পাঠাগারে বই পড়ার পাশাপাশি কম্পিউটার ব্যবহার, ল্যাবের সুবিধা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ রয়েছে। চেয়ার-টেবিলের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বাংলা ও আধুনিক বাদ্যযন্ত্র। গ্রামের শিশু-কিশোর ও তরুণেরা এখানে বই পড়ার পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখে এবং সংগীতচর্চায় অংশ নেয়। ফলে পাঠাগারটি কেবল বই পড়ার জায়গা নয়, নতুন প্রজন্মের জ্ঞান ও সৃজনশীলতা বিকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর হয়ে উঠেছে।

পাঠাগারের প্রতি ভালোবাসা থেকেই মাটির ব্যাংকে টাকা জমাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা দীপিকা রানী। তার পরিবারের পক্ষে একসাথে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা সম্ভব নয়। তাই সংসারের খরচ মেটানোর পর সামান্য যা বাঁচে, তা-ই জমিয়ে রাখেন মাটির ব্যাংকে।

স্থানীয় বাসিন্দা মেরিনা বেগম বলেন, পাঠাগারে বই পড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ ঘটছে। বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই মাটির ব্যাংকে সামান্য সঞ্চয় জমিয়ে পাঠাগারের উন্নয়নে সহযোগিতা করছেন তিনি।

আরেক বাসিন্দা সাজেদা বেগম বলেন, পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠার পর গ্রামে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। তরুণ-তরুণীরা পাচ্ছে সংগীতচর্চার সুযোগ।
তিনি বলেন, সংসারের খরচের পর বেঁচে যাওয়া টাকা মাটির ব্যাংকে জমাই। তিন মাস পর প্রতিটি ব্যাংকে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পাওয়া যায়। এই সঞ্চয় দিয়ে পাঠাগারের উন্নয়ন হবে, এটাই আশা।

গ্রামের এ উদ্যোগের সুফল পাচ্ছে নতুন প্রজন্মও। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিমাই চন্দ্র রায় জানায়, তার মা মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে রাখেন। তিন মাস পর সেই ব্যাংক পাঠাগারে নিয়ে আসা হয়।

নিমাই বলে, আমরা নিয়মিত পাঠাগারে আসি। এখানে বই পড়ি, বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখি এবং সংগীতচর্চা করি। আমাদের গ্রামের এই পাঠাগারটি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।

পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা জামাল হোসেন টাইমস টুডেকে বলেন, মাত্র ১০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু করা পাঠাগারটিতে এখন ১৮ হাজারের বেশি বই রয়েছে। গ্রামের মানুষের মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে পাঠাগারের উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়টি তাকে অভিভূত করেছে। বর্তমানে ২০টি কৃষক পরিবার এ উদ্যোগে যুক্ত। তাদের প্রত্যেককে একটি করে মাটির ব্যাংক দিয়েছেন তিনি। তার তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে এসব ব্যাংক থেকে জমা হয়েছে ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা।

জামাল হোসেন বলেন, দ্বিতল ভবনের কাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত তারা এভাবে সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন। আমরা খুব দ্রুতই ভবনের দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজ শুরু করতে চাই।

রবিন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজ লিমিটেডের পরিচালক শাহীন হোসেন বলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষের পাঠাগারের প্রতি এই মমত্ববোধই প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের বড় অনুপ্রেরণা।